Total Pageviews

Wednesday, January 19, 2011

গদ্য / চিন্তন

অচিন পাখি
সংকলন : মৃত্তিকা দাস

এই প্রবন্ধের শরীরে গাথা আছে বিভিন্ন কথা, লেখা, কথোপকথন। একটা পথ চলার সাক্ষী এ লেখা। সে পথ নিস্তব্ধ, গভীর, নির্জন। একটা ছটফটানি হাতছানি, ব্যস আর বুঝতে পারি না। দেখতে পাই না এ দু'নয়নে। ভিতরের কোন এক নাছোড় বান্দার ফরমায়েশে তৈরি হয়ে চলে এ লেখা। আর আমি হাঁটতে থাকি শুধু নিজের ভিতরে, আরো গহীনে অচীন পাখির সাক্ষাৎের আশায়। এই লেখার প্রথম অংশ আবু ইসহাক হোসেন-এর লেখা,দ্বিতীয়-তৃতীয় অংশ মোমেন মাঝি-র লেখা এবং শেষ অংশে প্রদোষ কান্তি সরকার-এর লেখা ধারণ করতে পেরে কৃতজ্ঞ। প্রতিটি লেখার কর্তিত রূপ এখানপ ব্যবহৃত হয়েছে।

বাউল শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ
ব্যবহারগত দিক দিয়ে বাউল শব্দটির ইতিহাস খুব প্রাচীন নয় বলে গবেষকদের অধিকাংশের মত। তাদের মতে বাংলা সাহিত্যে বাউল শব্দের ব্যবহার আমরা লক্ষ করি মালাধর বসুর ‘শ্রীকৃষ্ণ বিজয়’ কাব্যের মাধ্যমে। মালাধর বসু তাঁর কাব্যে উপমা হিসেবে বাউল শব্দটি এভাবে ব্যবহার করেছেন,
‘মুকুল মাথার চুল/নাংটা যেন বাউল/রাক্ষসে রাক্ষসে বুলে রণে।’
বাউল শব্দটির ব্যবহার আরো ব্যাপক অর্থে আমরা লক্ষ করি ‘চৈতন্য চরিতামৃত’ কাব্যে। সেখানে বাউলের ছবি আঁকতে গিয়ে বাউলকে এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে,
‘বাউলকে কহিও লোক হইল আউল /বাউলকে কহিও হাটে না বিকায় চাউল /বাউলকে কহি কাযে নাহিক আউল /বাউলকে কহিও ইহা করিয়াছে বাউল’
মোটামুটিভাবে বলা যায় পঞ্চদশ শতকে বাউল শব্দটা আমাদের গোচরে আসে। বাউলরা তাদের আদিপুরুষ হিসেবে বীরভদ্রকে মানে যার জীবনকাল ছিল (১৪৭৩-১৫৪৪)। এ প্রসঙ্গে ডক্টর এম.এ. রহিম তার বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, বাউলগণ নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্রকে তাদের প্রথম গুরুরূপে অভিহিত করে এবং বিশ্বাস করে যে, তিনি মাধব বিবি নামক জনৈক মুসলমান রমণীর কাছ থেকে বাউল ধর্মমত শিক্ষা করেন’ । এসব তথ্যের উপর নির্ভর করে বলা যায় যে বাউল শব্দের আবির্ভাব পঞ্চদশ থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে।
বাউলমতের উদ্ভব নিয়ে যেমন চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যায় না তেমনি বাউল শব্দটির উদ্ভব নিয়ে রয়েছে নানা মুণির নানা মত। কোন কোন গবেষকের মতে সংস্কৃত ‘ব্যাকুল’ বা ‘বাতুল’ শব্দ হতে বাউল শব্দের উৎপত্তি যার অর্থ হলো উন্মাদ, পাগল। আবার কারো কারো মত হিন্দি ‘বাউর’ শব্দ থেকে বাউল শব্দটি বাংলায় এসেছে যার অর্থ হলো পাগল। ড. এস এম লুৎফর রহমান বাউল শব্দের উদ্ভবের ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে চর্যাগীতি রচনার কথা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন যে বাউল শব্দটি একটা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বর্তমান আকারে এসেছে। তিনি মনে করেন বাজির, বাজ্জিল, বাজুল এগুলি বাউল শব্দের আদিরূপ। তার মতে বাউল শব্দটির বিবর্তনের ক্রমপর্যায় এমন -- বাজ্রী-বাজ্জির-বাজির-বাজ্জিল-বাজিল-বাজুল-বাউল। বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে শব্দটির রূপ ভিন্ন হলেও এর অর্থের কোন হেরফের হয়নি। এক্ষেত্রেও বাউল বলতে ভাবে উন্মাদ বা পাগলকেই বোঝানো হত। কিছু কিছু পণ্ডিতের মতে বাউল শব্দটি উৎপত্তিগতভাবে বাংলা। অর্থাৎ বাংলা থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি।
ড. আনোয়ারুল করীম-এর মতানুসারে বাউল শব্দের উৎসভূমি পারস্য। তিনি বলেছেন, মরুভূমিতে এখানে-সেখানে বিচরণকারী সংসারত্যাগী একশ্রেণীর সঙ্গীতাশ্রয়ী, সুফী সাধক বা ‘আল’ অথবা ‘বউল’ নামে পরিচিত ছিল। এরা অধ্যাত্মবাদী এবং এদের সাধনপদ্ধতি ছিল গুপ্ত ও যৌনাচারভিত্তিক। আমাদের আলোচ্য বাউল সম্প্রদায় পারস্যের এই ‘আল’ বা ‘বউল’ সম্পদায়ের উত্তরসূরি’ । তিনি বাউল শব্দের বাংলায় প্রথম ব্যবহার বিষয়েও ভিন্ন মত পোষণ করে বলেছেন, চর্তুদশ শতকে শাহ মুহাম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ জোলেখা’ গ্রন্থে সর্ব প্রথম এই ধর্মীয় সাধকদের ‘বাউল’ এবং ‘বাউর’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে’।
বাউল শব্দের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস যা-ই হোক সর্বক্ষেত্রেই এটা একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নেই। অর্থাৎ বাউল বলতে এমন এক ব্যক্তি বা ব্যক্তিসমষ্টিকে বোঝায় সমাজের চোখে যারা নি:স্ব এবং পাগল। তাদের কোন সামাজিক মর্যাদা নেই, বিষয় সম্পত্তি বা সামাজিক প্রতিপত্তি বলতে কোন কিছুই নেই। তাদের কোন স্খায়ী বসতবাড়ি নেই। তারা একস্খান হতে অন্য স্খানে ঘুরে বেড়ায় এবং পরান্নে জীবন ধারণ করে বেঁচে থাকে। বাউল সে যে সমাজেরই হোক তার বৈশিষ্ট্য, জীবনযাপন প্রণালী, সমাজে তার সামাজিক অবস্খান একই। ড. আনোয়ারুল করীম তার ‘রবীন্দ্রনাথ ও বাংলার বাউল’ গ্রন্থে বলেন, একশ্রেণির সাধক যারা ‘ফকির’ বলে পরিচিত এবং পেশায় ভিক্ষজীবী, সাধনসঙ্গিনী নিয়ে এক অঞ্চল থেকে আর এক অঞ্চলে গান গেয়ে ফেরে, সমাজে যাদের পরিচয় অতি সাধারণ, অর্থাৎ যারা অন্ত্যজ, তাদেরকে বাউল বলা হয়ে থাকে। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে সেখানে তারা সামাজিকভাবে নিন্দিত’।
বাউল সম্প্রদায়ের বিকাশ এবং বিস্তারের সর্বশেষ পর্যায়ের পর্যালোচনায় দেখা যায় বাংলাদেশে সংসারত্যাগী বাউলের পাশাপাশি গৃহী বাউলেরও উদ্ভব হয়েছে। তবে তাদেরও সামাজিক অবস্খান ও মর্যাদা সমাজে খুবই হীন। তাই দেখা যায় বাউল সে গৃহী বাউল হোক আর গৃহত্যাগী বাউলই হোক সমাজের তাদের অবস্খান একেবারেই নিম্নস্তরে।

একভাণ্ড ইতিহাস ও দর্শন
চৈতে-নিত্যে-অদ্বৈ এই তিন পাগলের ভাবশিস্য বাউল ধর্মের শিরোমনি সিদ্ধপুরুষ ফকির লালন শাহ (বাঙালির ধর্ম প্রচারক) কলিকালের অবতার চৈতন্য।জাত-পাতের যাঁতাকলে পিষ্ট দরিদ্র মানুষের গৌরাঙ্গ, জাতহীন। নারী পুরুষ এক দেহে ধারণ করে আবির্ভূত।সিদ্ধপুরুষ লালন বাংলা ও এর বাইরে থেকে আসা সমস্ত মতবাদ আত্তীকরণের সর্বোচ্চ বঙ্গীয় প্রকাশ।
সমগ্র সিন্দ্ধু ও গাঙ্গেয় উপত্যকা তথা ভারতবর্ষ হাজার হাজার বছর ধরে ধারণ করছে অসংখ্য মানবের জীবন।নৃতাত্বিকভাবে জন্ম হয়েছে অনেক ভাষা, সংস্কৃতি বা এর বিশেষ রূপ ধর্ম।শত শত ধর্মীয় সম্প্রদায়ের হাজারো রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠান, পূজা-অর্চনার যে সনাতনী সংস্কৃতি তাই পরবর্তিতে হিন্দু ধর্ম নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।পারসিয়ান ও আরবীয়রা মশলার ব্যবসাসূত্রে ভারতের সাথে পরিচিত হয়। এবং সিন্দ্ধু অঞ্চলের মানুষদেরকে সিন্দ্ধ্ বা ইন্দু বা হিন্দু বলে তারা অভিহিত করে ফলশ্রুতিতে তাবত দুনিয়ার মানুষের কাছে ভারতীয়রা হিন্দু ও তাদের সংস্কৃতি বা ধর্ম হিন্দু ধর্ম নাম লাভ করে বলে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মত। বহুবিধ তণ্ত্র-মণ্ত্র- ডাক-যোগ দর্শনের প্রকাশ্য ও গোপন চর্চা অথবা কপিল, বৃহস্পতিদের বস্তুবাদী চার্বাক দর্শনের অভূতপূর্ব ভূমি ভারত। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় বা দার্শনিক সম্প্রদায়ের সহ অবস্থানের ফলে জীবনাচরনের মিলন, ভিন্নতা, ধর্মের ক্রমবিকাশ, নতুন নতুন ধর্মের আবির্ভাবে ভারত যেন এক গরম তাওয়া ।এখানে উদ্ভুত বৌদ্ধ ধর্ম পারস্য, মধ্যপ্রাচ্য আর মধ্য এশিয়া বাদ দিলে সমগ্র এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে।ভারতীয় ধর্ম বিস্তারিত হয়েছে অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা ছাড়া ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটেছে ফলে ব্যক্তি বা ভাষা সম্বন্ধী ধর্মসমূহ প্রবাহিত হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রক্ষমতা ও ধর্ম অনুপ্রবেশ করেছে যুগপৎভাবে।দার্শনিক এই অবস্থানের কারণেই হয়তো ভারতীয়রা উপনিবেশ গড়ে তুলে নি কখনো কিন্তু উপনিবশিত হয়েছে বার বার।উপনিবেশকারীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মোগল আর ইংরেজরা।
সপ্তম শতকের তিরিশের দশকে মক্কা জয়ের পর আরবরা ইসলামের দর্শন হাতে নিয়ে দিগ্বিজয়ে বের হয় এবং ইসলাম ধর্ম প্রবাহিত হয়ে পশ্চিম দিকে মরোক্ক পর্যন্ত। পুরানো সকল সংস্কৃতির খোলনলচে পালটে ফেলে এমন কী মুখের ভাষা পর্যন্ত প্রতিস্থাপিত করে কায়েম করে আরব বিশ্ব।এ প্রবাহের অতিরিক্ত সংযোজন স্পেন। এরপর ফ্রান্সের গলে গিয়ে ক্ষান্ত হয় আরবদের পশ্চিমমুখী যাত্রা। পূর্ব প্রবাহ ব্যাপকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় পারস্যে।পারসিক সংস্কৃতির কাছে মুষড়ে পড়ে আরব সংস্কৃতি।ইরানে ইসলাম রূপান্তরিত হয়। ইরানের পার্শ্বে বাগদাদ দীর্ঘ দিন ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।আব্বাসীয়রা মুতাজিলাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। ইসলামে যৌক্তিকভাবে আল্লার উপস্থিতি প্রমাণে প্রভাব বিস্তারকারী মুতাজিলারা ব্যর্থ হলে প্রভাব বিস্তার করে সুফীজম।যার উর্বর ভূমি হলো পারস্য বা ইরান।
সপ্তম শতক থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ শতকে এসে মুসলমানরা মোটামুটি পুরো ভারতবর্ষ দখল করে।কিন্তু ততোদিনে ইরানের দেয়ালে ধাক্কা খাওয়া ইসলাম অনেকটা ভিন্নরূপে যা কীনা প্রধানত ইরানের সুফীদের দ্বারা প্রচারিত হয় ভারতে।মোহাম্মদ ও খোলেফায়ে রাশেদীনের পরে যে নামগুলেো শুনা যায় তা হল‌ –-- বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী, খাজা বাবা মইনূদ্দীন চিশতী, বাবা ফরীদ, নিজাম উদ্দীন আউলিয়া, শাহ জালাল ইত্যাদি যারা সকলেই সুফী।পারস্য আর মধ্য এশিয়া থেকে ঝাকে ঝাকে পীর-আউলিয়ারা ভারতে ধর্ম প্রচার করে যাকে বলা যায় ইসলামের বিস্তার।
মরমি কবি ফকির লালনকে জানার চেষ্টার প্রারম্ভে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত ব-দ্বীপের অনিশ্চিত কৃষিভিত্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন এবং সনাতনী তথা হিন্দু, বৌদ্ধ এবং ইসলাম এই তিন ধর্মের মিথষ্ক্রিয়ার মানস জগৎ বিবেচনায় রাখা দরকার। হিন্দু ধর্মজাত বৈষ্ণব ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্মের সহজিয়া মতবাদ, ইসলামের সুফী মতবাদ বাংলায় যা মূলত মারেফত বা মাইজভাণ্ডারী নামে পরিচিত -- এই তিন মূল ধারার মিলনের ফলে উদ্ভূত বাংলার ধর্ম হলো বাউল ধর্ম।
বাউল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়।বাউলদের ধর্মের তত্ত্ব ও দর্শন আছে, সাধন পদ্ধতি আছে, সাধক জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা আছে, জগৎ ও জীবন সম্পর্কে তাদের একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে, এ সমস্তই ব্যক্ত হয়েছে তাদের গানে।এই সম্প্রদা্য়ের সাধকগণের তত্ত্ব দর্শন ও সাধনা সংবলিত গানই বাউল গান।রূপ থেকে স্বরূপে ওঠাই বাংলার বাউলদের সাধনা। কীভাবে পুরূষ-প্রকৃতি ( জীবাত্মা-পরমাত্মা/ নারী-পুরুষ) বিভক্ত হ'ল এবং কীভাবে দুই দেশে না থেকে একত্রে রইল। পদ্ম কোথায় প্রস্ফুটিত হয়, পদ্ম পুস্পের রসে কীভাবে সাধন হয় এবং সহস্রদল হতে রজঃস্রোতের সঙ্গে রসরাজ লীলা করতে করতে অগ্রসর হয়ে তিন দিন তিন রূপ ধারণ করে শেষে সহজ মানুষ রূপে আত্মপ্রকাশ করেন।তারপর প্রকৃতি-পুরুষের শৃঙ্গার দ্বারা উর্ধ্বগত হয়ে স্বস্থানে গিয়ে যুগল হয়ে নিত্যরস লীলা আস্বাদন করেন -- বাউল সাধনার মূলভাবটি মোটামুটি এর মধ্যে ব্যক্ত। এর থেকে বোঝা যায় বা্উল সাধনা নারী-পুরুষের যৌথ সাধন পদ্ধতি।
অদ্বৈতাচার্য ও নিত্যানন্দ প্রকৃতি-পুরুষ মিলন ঘটিত ধর্মসাধনার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। নিত্যানন্দের পুত্র বীরভদ্রের সময় হতে বাউলরা সম্প্রদায় হিসেবে প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গুরু পরম্পরায় ব্যাপ্ত হয় সারা বাংলায়।
বাউল সাধনার তিন স্তর। প্রবর্ত -- ভগবানের নিকট দৈন্য ও গুরুর করুণা প্রার্থনা। সাধক -- দেহতত্ত্ব, মনের মানুষ, সাধনার স্বরূপের জ্ঞান লাভ। সিদ্ধ –-- সাধনার পূর্ণতার স্বরূপ। ফকির লালন ছিলেন সিদ্ধপুরুষ। বিশাখা লালনের সাধিকা।

লালন তথা বাউলদের যৌন সাধন
বাঙালির কাছে যৌনতা বিষয়টি অনেক বড় ট্যাবু।নিয়মিত যৌন কাজে লিপ্ত হবে কিন্তু মুখে বলবেনা। চিন্তা করুন লালনের জীবন কাল আঠার শতকের শেষের দিক থেকে উনিশ শতক, সমগ্র ভারত বৃটিশদের দখলে। তথাকথিত মুসলমানদের (মোঘল) হাত থেকে নাছারারা ক্ষমতা দখল করেছে, মুসলমানরা জাত যাওয়ার ভয়ে শিক্ষা-দীক্ষা বাদ দিয়ে না বুঝে কোরান মুখস্ত করে জাত রক্ষায় ব্যস্ত।হিন্দুরা জাত-পাতের ঘেরাটোপ আর ইংরেজি শব্দ মুখস্ত করে অফিসের কেরানী বা বাবুগিরির মধ্যে ঘোড়পাক খাচ্ছে। এমন সমাজে সম্পুর্ণ ভিন্ন স্কুল হল বাউলদের।
আধ্যাত্বিকতার চর্চায় মানবদেহকে ঈশ্বরের আবাস (বারামখানা) মনে করে বলে বাউলরা দেহ্তত্ত্বে ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করে। লালনের গানের বিশাল অংশ জুড়ে দেহতত্ত্বের গান। দেহ থেকে দেহে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঈশ্বরের ধারাবাহিকতায় সঙ্গম বা নারী-পুরুষের মিলন বাউলদের সাধনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
লালনের সময়কালে বা তার আগে পরে বাউলরা সবসময় নিজেদের সাধন পদ্ধতির ব্যাপারে গোপনীয়তা রক্ষা করত। যেহেতু তাদের আখড়ায় অনেক সাধিকা থাকতো এবং বাইরের মানুষকে তারা নিজেদের জীবনাচরণ বলতোনা ফলে সহজেই নানারকম কুৎসা রটনা করেতে পেরেছে নিন্দুকেরা। আবদ্ধ সমাজে যৌনতা বিষয়ে গুজব ছড়ানো খুবই সহজ। আর বিশাল এই সম্প্রদায়ের কোথাও কোথাও নাকি বিপথগামী কিছু বাউল আখড়ার পাশে পতিতালয় গড়ে নিতো। এটি মূল ধারা নয়।
এবার আসা যাক সোজা কথায় তাদের সাধনা কী? লালনের গানে প্রায়ই শোনা যায় 'সহজ মানুষ' বা 'অটল রূপ' 'মনের মানুষ' 'অচিন পাখি' বা আলেকজনা এর দ্বারা কী বুঝায়? খুব সহজ ভাবে বললে এর দ্বারা গুরু, মুর্শিদ, রাসুল, আদম, ভগবান, আল্লা, ঈশ্বর ইত্যাদিকে বুঝায়। কিন্তু লালন ঈশ্বরের সর্বোচ্চ রূপ মানবদেহের প্রানের ধারার সাথে কীভাবে মিশে থাকে সে রহস্য উৎঘাটনে সচেষ্ট ছিলেন। লালন তথা বাউলদের এ লক্ষ্যে সাধন পদ্ধতির সম্পর্কে যৎসামান্য জানা যায়।
পুরুষের বীজ আর নারীর রজঃ মিলিত হয়ে মানবের জন্ম। আর এই দু'য়ের উৎপত্তি সঙ্গমকালে। যৌন উত্তেজনার চুড়ান্ত পর্যায়ে সহজ মানুষ বা ঈশ্বরের অটলরূপ উপস্থিত হয়। বাউলরা এই স্তরে পৌঁছে স্থির থেকে সাধন করতে চায়। কাম নদীর নিন্মমুখী ধারাকে ঊর্ধমুখী করে যারা দীর্ঘক্ষণ ধরে অরগাজমে থেকে সহজ মানুষ সাধন করতে পারে তারা হলো সিদ্ধ পুরুষ।ফকির লালন একজন সিদ্ধপুরুষ।এবার দেখা যাক লালন তার গানে কী বলছেন:
আমি কী সন্ধানে যাই সেখানে
মনের মানুষ যেখানে।
আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি
দিবা রাতি নাই সেখানে।

যেতে পথে কাম নদীতে
পারি দিতে ত্রিবিণে (ত্রিবেণী)
কত ধনীর ধারা যাচ্ছে মারা
পইড়ে নদীর তোড় তুফানে।

রসিক যারা চতুর তারা
তারাই নদীর ধারা চিনে
উজান তরী যাচ্ছে বেয়ে
তারাই স্বরূপ সাধন জানে।

লালন বলে মইলাম জ্বলে
মইলাম আমি নিশি দিনে
আমি মনিহারা ফণির মতো
হারা হলাম পিতৃধনে।
এমন অসংখ্য গানে গানে লালন বা বাংলার অন্যান্য বাউলরা নিজেদের প্রেম, কাম, সাধনের কথা বলে গেছেন। রূপ (ঈশ্বর বা পরমাত্মা) থেকে স্বরূপে (মানব ও ঈশ্বর লীন) ওঠাই বাংলার বাউলদের সাধনা।
ছোটবেলা থেকে শুনতাম আল্লা থাকে সাত আসমানের উপরে।মনে করতাম আমরা তো এক আসমান দেখি তার উপরে বুঝি বাকীগুলো। বিজ্ঞানের হাতেখড়িতেই গ্রহ নক্ষত্র ইত্যাদি পড়ে সব কিছু কেমন যেন হয়ে গেল। হিসেব মেলে না। ছোট বেলাতেই গ্রামের লোকজনের মুখে শুনেছি 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়... আট কুঠুরী নয় দরজা...।' কার গান কী বলছে কিছুই বুঝতাম না। কাউকে জিজ্ঞেস করলে আমাদের দেহে আত্মার যাওয়া আসা পর্যন্ত উত্তর মিলতো।কিন্তু কোথায় আট কুঠুরী নয় দরজা বা সাত আসমান?
বাউলদের সম্পর্কে জানা খুবই কঠিন কাজ। বলা হয়ে থাকে 'শম্ভুকের মতো আত্মসংকোচনশীল, আত্মগোপনশীল জীবন যাত্রার রীতি এই বাউলদের'। বাউলরা তাদের আধ্যাত্বিকতায় ব্যবহার করেছে ভারত পারস্য ও আরবের মিথ।ভারত হল মিথের মক্কা। ফলে ধর্মের তত্ত্ব ও মিথের সহযোগিতায় তাদের সম্পর্কে কিছু ধারণা করা যেতে পারে। লালনের খুবই পরিচিত একটি গানের কথায় আসা যাক:
ধন্য ধন্য বলি তারে
বেঁধেছে এমনও ঘর শুন্যের উপর
আ মরি শুন্যের উপর পোস্তা করে
ধন্য ধন্য বলি তারে।
খুব সুন্দর বোঝা যাচ্ছে ঈশ্বর তার বারামখানা এই মানব দেহ শক্ত করে তৈরী করেছে। কিন্তু কোথায়? শুন্যের উপর। শুন্য কী? বিজ্ঞানে এর কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। যে কোন কিছুকে আমরা আপেক্ষিকভাবে শুন্য ধরতে পারি। শুন্যের জন্মভূমি ভারত। বুদ্ধের মূল দর্শনই হলো শুন্যবাদ। নাগার্জুন শুন্য সম্পর্কে বলেছেন " অস্তি-নাস্তি-তদুভয়ানুভয়চতুষ্কোটি বিনির্মুক্তং শুন্যরূপম"। সহজ ভাবে বললে দাঁড়ায়:
আছে যে তা নয়
নাই যে তাও নয়
আছে নাই উভয়ই তাও নয়
আছে নাই উভয়ই যে নয় তাও নয়।
এই চার মুক্ত কোন কিছু হলো শুন্য। এরই উপর ঈশ্বর পোস্তা করে ঘর বেঁধেছে। তাই ফকির লালন বলছেন ধন্য ধন্য বলি তারে। পরের স্তবক:
ঘরে মাত্র একটি খুঁটি
খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি
কিসে ঘর রবে খাড়ি
ঝড়ি-তুফান এলে পড়ে।
ঘরের একটি খুটি বলতে কী বোঝায়? প্রাণিবিজ্ঞানে পড়েছি সমস্ত প্রানিজগতকে মোটা দাগে দুভাগে ভাগ করা যায় মেরুদণ্ডী, অমেরুদণ্ডী।এই মেরুদণ্ড প্রাণির বিবর্তনের খুবই বড় একটি ধাপ। মেরুদণ্ডের কশেরুকার ভিতর দিয়ে তিনটি স্নায়ু পেচিয়ে পেচিয়ে (কুণ্ডলী স্ত্রীবাচক কুণ্ডলিনী) মাথায় গিয়ে মিলেছে। যা ভারতীয় তান্ত্রিকদের কাছে অনেক সময় ত্রিবেণী নামেও পরিচিত। সুষুন্মা, ইড়া,পিঙ্গলা। সুষুন্মা অক্ষের মতো যাকে পেচিয়ে বাকি দুটি। ইড়া বাম শুক্রাশয় থেকে ডান নাসারন্ধ্র পর্যন্ত। শ্বেত বর্ণের শান্ত সৌম্য ও চাঁদের সাথে তুলনীয়। পিঙ্গলা (লাল) ডান শুক্রাশয় থেকে বাম নাসারন্ধ্র পর্যন্ত বর্ধিত। ভয়াবহ শক্তিশালী ও সূর্যের সাথে তুলনীয়।
ত্রিবেণীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্তরে স্তরে বিভিন্ন কুঠুরী বা পদ্ম ফুলের বর্ণনা করা হয়েছে। পদ্ম গাঙ্গেয় অঞ্চলের খুব সাধারণ ফুল এবং প্রচুর মিথ এর সাথে যুক্ত। ব্রহ্মা স্বপ্ন দেখেন। তার নাভিমূল থেকে পদ্ম ফুল ফুটে স্বরস্বতী পদ্মফুলের উপর আবির্ভূত হন। প্রাণির দেহে ফুলের সনাক্তকরণ যাদের গ্রামদেশে বাড়ী তারা সহজেই করতে পারবেন। গরু ছাগলের বাছুর হওয়ার পর লোকজন পাহাড়া থাকে যেন ফুল না খেয়ে ফেলে। গরু তৃণভোজী কিন্তু এই আমিষ জাতীয় খাদ্য সরিয়ে না ফেললে সে অবশ্যই খায়। লালন তার গানে সরাসরি ফুল শব্দটিও ব্যবহার করেছেন।
কমল কোঠা কারে বলি
কোন মোকাম তার কোথা গলি
সেইখানে পড়ে ফুলি
মধু খায় সে অলি জনা।
একমাত্র খুঁটি সুষুন্মার শুরু থেকে শেষ অবধি কুণ্ডলিনীর (ত্রিবেণী) বিভিন্ন স্তরে সাধনার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন চৈতন্য জাগ্রত করে শেষে ঈশ্বরের সাথে লীন হওয়াই দুনিয়ার সমস্ত সাধকের উদ্দেশ্য। সাধকের রূপান্তরের এই স্তর বা চক্র বা ফুল বা কুঠুরী বা আসমান উপমায় কখনও সাত কখনও আট বা নয় ধরনের স্তরের কথা বলা হয়ে থাকে। লালন ৭, ৮, ৯, সবই ব্যবহার করেছেন:
দেশ দেশান্তর দৌঁড়ে কেন মরছ রে হাপিয়ে
আদি মক্কা এই মানব দেহে
দেখনারে মন ধ্যেয়ে।
মানুষ মক্কা কুদরতি কাজ
উঠেছে আজগবি আওয়াজ সাত তলা ভেদিয়ে।
আছে সিং দরজায় তারি একজন নিদ্রা ত্যাগি হয়ে
দেখনারে মন ধ্যেয়ে।
অথবা যে গানটি ধরে আলোচনা করছি তার পরের অন্তরায়:
মূলাধার কুঠুরী নয়টা
তার উপরে চিলে কোঠা
তাহে এক পাগলা ব্যটা
বসে একা একেশ্বরে।
ভারতীয় মিথে সাধনার এই স্তরসমূহকে মুলতঃ সাত চক্রেই আলোচনা করা হয়েছে। কোথাও বা উপবিভাগ করেছে আট বা নয় চক্রে। সুষুন্মার ভিত্তি বা মূলকে বলা হয় মূলাধার চক্র।



মূলাধারের অবস্থান যৌনাঙ্গ ও পায়ু পথের মাঝে। চিত্রে বৃত্তের ভিতর চতুর্ভূজের দ্বারা বুঝানো হয়েছে পার্থিব বিষয় আশয়। হাতির পিঠের উপর নিন্মগামী ত্রিভূজ দ্বারা যোনী তথা বিশ্বমাতা, এর মাঝখানে পুরুষ প্রতীক শিবলিঙ্গ যাকে সাড়ে তিন প্যাচে জড়িয়ে সর্প দেবী কুণ্ডলিনী। এবার আসা যাক হাতির কথায়। হাতি ভারতে একটি মিথিক চরিত্র। মিথ অনুসারে একদা হাতি মেঘের মতো রূপ পরিবর্তন করতে পারত, উড়তে পারত।একদিন সে উড়ে গিয়ে বসল এক ডালে। ঐ গাছের নীচে এক সাধু তার শিষ্যদের পড়াচ্ছিলেন। এমন সময় ডাল ভেঙ্গে কয়েকজন শিষ্য মারা গেল আর হাতি সুন্দর উড়ে গিয়ে বসল অন্য ডালে। সাধু সাথে সাথে রেগে গিয়ে সমস্ত হাতি জাতিকে অভিশাপ দিলেন। হাতি তার রূপ পরিবর্তন ও উড়ার ক্ষমতা হারাল। এর পর থেকে হাতি পৃথিবীতে হেঁটে চলা একখণ্ড অভিশপ্ত মেঘ। হাতির এই সিম্বল থেকে বোঝা যায় শর্তমুক্ত হলে সহজেই পৌঁছানো যায় পরবর্তি কুঠুরীতে। মূলাধার স্তর সাধকদের কাছে খুবই স্থুল পর্যায়। এর দ্বারা পরিচালিত মানুষজন সক্রিয় নয়।
পরের চক্র স্বধিস্থান।


এটি কুণ্ডলিনীর বিশেষ আবাস।শরীরের যৌনাঙ্গ বরাবর এর অবস্থান। এই চক্রে কুণ্ডলিনী জাগ্রত হলে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয় সেক্স। চিত্রে জলের অসুর মকর এর প্রধান উপাদান। ফ্রয়েড জীবনের এই চক্রের আলোচনা করেছেন ভালোভাবে। ভারতীয় সাধকেরা এই কুঠুরী উত্তরণের ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত। একটি ধারা কামকে হ্যা বলেছে অন্যটি না। বাউলরা প্রথমটি।
৩য় তলা হলো মনিপুর।


নাভির লেভেলে এর অবস্থান। মানুষের ভোগবাদীতা,দখল মনোবৃত্তি ইত্যাদির প্রকাশ এখানে। বর্তমান পশ্চিমা জগতের জীবনে এই চক্রের প্রাধান্য।
উল্লেখিত চক্রসমূহ সাদামাঠা। যারা এর মধ্যে জীবন যাপন করে তাদের জাগতিক চাওয়া পাওয়াই নির্ধারণ করে জীবনের সুখ-দুঃখ।এরা নিষ্ক্রিয় বা প্রতিক্রিয়াশীল। গুরু ঠাকুর বলেছেন 'পনের আনা মানুষ আসে খায় সন্তান উৎপাদন করে মারা যায়।'
পরবর্তি চক্র সমূহ উঁচু স্তরের।অনেকটা শরিয়ত-মারিফতের পার্থক্যের মতো। দান্তের মতে নতুন জীবনের শুরু।
চক্র চার অনাহত।


হৃদপিণ্ডের বরাবর এই পদ্ম। অনাহত মানেই আঘাত হীন। আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা হল আঘাত ছাড়া শব্দ অসম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানের Big Bang আল্লার কুন বা ভারতের ওঁম এই সব শব্দ আমাদের চেনা বস্তুর আগে। সাধকেরা চিরন্তন সেই আঘাতহীন শব্দ শোনার সাধনা করে। রাবেয়া বসরী বলেছেন নৈশব্দই সেরা ইবাদত। তিনি নদীর পারে বসে এই ইবাদতই করতেন।অনাহত শব্দ শোনার পরে পরবর্তি কুঠুরীতে গমন।
চক্র পাঁচ বিশুদ্ধ ।


এর অবস্থান গলায়। কুণ্ডলিনী যখন এই তলে পৌঁছা্য় তখন সাধকের সাথে ঈশ্বরের কথাপকথোন হয়। চিত্রে নিন্মমুখী ত্রিভুজের ভিতর পূর্ণ বৃত্ত হলো পূর্ণ চন্দ্র। লালন তার বহু গানে বলেছেন এই চাঁদের কথা। এখানকার দেবতা হলো অর্ধনারিশ্বর শিব। সাধকেরা দেখতে পান পারে যাওয়ার তরী।
লালন অসংখ্য গান লিখেছে পারাপার তত্ত্বের। চির মুক্তি লাভের এই যাত্রা খুবই বিপদ সংকুল। ঠিক সেই ফুলসেরাতের পুলের বর্ণনা। ওপারে আছে চির যৌবন অনন্ত ভূমি এক কথায় স্বর্গ।
সিদ্ধ পুরুষ হতে আর দু চক্র বাকী।
অহনা ষষ্ঠ চক্র।


দুই ভ্রুর মাঝে উপরে মেয়েরা যেখানে টিপ পড়ে সেখানে এই চক্রের অবস্থান। সুফীদের ফানা ফিল্লা্হ বা ঈশ্বরের সাক্ষাৎ বা দিদার। রামকৃষ্ণের বর্ণনায় এ স্তরে কিছুটা আমি বা ইগো থেকে যায়। তিনি বলেন এ যেন ঠিক কাঁচে ঘেরা বাতি। সবই দেখা যায় তবু থেকে যায় বাঁধা। মোহাম্মদের মিরাজে আল্লা ও তার মাঝে একটি পর্দা ছিল।
সহস্র সপ্তম চক্র।



এই স্তর হল বাকা বিল্লাহ। ইউসুফ হাল্লাজের 'আয়নাল হক' বা আমিই সত্য। রামকৃষ্ণের বর্ণনায় কোন ধরণের বাঁধার অস্তিত্ত্ব নেই। শুধুই আলোর ঝলকানী। লালনের মতে দিবা রাতি নাই সেখানে। লালনের গানে দেখুন সহস্রের কথা:
যে রূপে সাঁই বিরাজ করে দেহ ভুবনে
গুরুর দয়া যারে হয় সেই জানে।
শহরে সহস্র পারা তিনটি পদ্মার এক মহেরা
আলেক ছোঁয়ার পবন খোড়া ফিরছে সেখানে।
গুরুর দয়া যারে হয় সেই জানে।
সহস্রের উপরে চিলে কোঠায় পাগলা ব্যাটা থাকেন।
এর পর লালন বলেন:
উপর নীচে সারি সারি
সাড়ে নয় দরজা তারি
লালন কয় যেতে পারি
কোন দরজা খুলে ঘরে।
সাড়ে নয় দরজা বলতে দুই চোখ, দুই কান, দুই নাক, মুখ, যৌনাঙ্গ, পায়ু। যৌনাঙ্গে নারীর দুই দরজা পুরুষের একটা গড়ে সাড়ে নয়।
ধন্য ধন্য বলি তারে
বেঁধেছে এমনও ঘর শুন্যের উপর
আ মরি শুন্যের উপর পোস্তা করে
ধন্য ধন্য বলি তারে।

বাউল ও সুফিবাদের আলোয় লালন-দর্শন
লালন একজন ফকির-দরবেশ, একজন সুফি-সন্ত, লালন বৈষ্ণব, তান্ত্রিক কিম্বা তত্বজ্ঞ কবি, লালন হিন্দু না মুসলমান – তিনি যে প্রকৃতপক্ষে কে এবং কী, এ ব্যাপারে দ্বিধা দ্বন্দের শেষ নেই।
লালন তো বাউল অবশ্যই ছিলেন। বাউল-শ্রেষ্ঠ ছিলেন বললেও অত্যুক্তি হবে না। বাউল সঙ্গীত বাংলার লোকসংস্কৃতির এবং লোকগাঁথার এক বিশেষ অঙ্গ। বাংলার জলবায়ুতেই তার পরিপুষ্টি। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত তথাকথিত অসংস্কৃত একশ্রেণীর গ্রাম্য লোকদের মুখে মুখে রচিত হত বাউল গান। ধর্মীয় বা লোকাচারের মোড়কে গ্রাম্যমানুষকে নীতি কথা শেখানোর জন্য বাউলশ্রেণীর উদ্ভব হয় নি, যেমনটি দেখা যায় অন্যান্য কিছু লোকসঙ্গীতের ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে গম্ভীরা, ভাদু, টুসু, মুর্শিদী ইত্যাদি। বাউল গান যদিও গ্রামীণ কথ্য ভাষায় গীত হত, কিন্তু এর পরতে পরতে যে গভীর তত্ত্বজ্ঞান লুকিয়ে আছে, তা বুঝতে বেশী সময় লাগে না। লালন ফকিরের বাউল গান এর সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ‘তত্ত্বকথা শ্রবণ, তত্ত্বসার গ্রহণ এবং তত্ত্ববিষয়ক চিন্তাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। দীর্ঘ আধ্যাত্ম সাধনায় তাঁর হৃদয়ে যে জ্ঞান সঞ্চিত হয়েছিল, তা প্রকাশ করার জন্য তিনি সুর ও ছন্দ অবলম্বন করেন। একারণেই তাঁকে তাত্ত্বিক কবি বলা হয়েছে’। এক কথায় বলা চলে লালন ছিলেন ‘মিষ্টিক’, যে অর্থে বৈষ্ণববাদ সুফিবাদ ‘মিষ্টিক’, সেই একই অর্থে লালনের ধ্যান-ধারণা ‘মিষ্টিক’। ‘মিষ্টিসিজম’ অল্পবিস্তর সব বাউলগানেই প্রচ্ছন্ন, কিন্তু লালন-গীতিতে তা এক অন্যরূপ, ভিন্নতর মাত্রায় জাজ্বল্যমান।
বাউল সঙ্গীত ও তার ইতিহাসকে বাদ দিয়ে লালনের তত্ত্বজ্ঞান ও দার্শনিকতার সঠিক মূল্যায়ন হতে পারে না। লালনের জীবন ও কর্মের ধারাটিকে সঠিক ধরতে গেলে বাউল সঙ্গীতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট একবার দেখে নিতে হবে। কেউ-ই সঠিক জানেন না বাউল সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা কে বা কারা। এটুকু বলা যায় বাউল ফকির বা গুরুরা কোন এক বিশেষ ধর্মের অনুগামী ছিলেন না। মুসলিম এবং হিন্দু দুই সম্প্রদায়ের লোকই বাউল সম্প্রদায়ভু্ক্ত ছিলেন আগে এবং এখনও। কয়েকজন বিখ্যাত ফকির গুরুর নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে যেমন হরিগুরু, বনচারী, অখিল চাঁদ কিম্বা পাগল নাথ, সাহেব ধনি প্রমুখ। একটি ব্যাপার বিশেষ উল্লেখ্য এই ব্যাপারে যে এই সব ফকির বা গুরুরা সবাই নদীয়া জেলার অধিবাসী ছিলেন এবং প্রায় সবাই ষোড়শ শতাব্দীর পরের দিককার। অনেক গবেষক এই কারণেই মনে করেন বাউল সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল এই নদীয়াতেই। নদীয়া অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে বখতিয়ার খিলজির হাত ধরে বাংলায় মুসলিম শাসন চালু হয়। সুফি প্রভাব তখন বাংলার সর্বত্র। সুফিচিন্তা ও ভাববাদের মধ্যে গ্রামবাংলার অত্যাচারিত ও দিকভ্রান্ত মানুষ দিশা খুঁজে পেতেন। এমনকি অনেক গবেষক মনে করেন চৈতন্যদেবের ভাবধারাতেও সুফিপ্রভাব ছিল। ‘চৈতন্যমঙ্গল’-এর লেখক জয়ানন্দ বলেছেন সেই সময় অনেক ব্রাক্ষণ জালাল উদ্দীন রুমির ‘মাথানবী’ পড়তেন। কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্য-চরিতামৃত’ গ্রন্থে চৈতন্যর সঙ্গে পীর-দরবেশের সাক্ষাৎকারের কথা আছে। চৈতন্য ভাগবত-এ আছে মহাপ্রভুর যখন ভাবদশার উদয় হত তখন –‘মুঞি সেই মুঞি -- সেই কহি কহি হাসে’। যা কিনা সুফি চিন্তা ‘আনা’ল হক’-এর সমার্থক (ভাবার্থ: I am the real)। প্রখ্যাত সমালোচক প্রমথ চৌধুরীর কথায় চৈতন্য মহাপ্রভুর হাত ধরে ব্যপ্ত ভারতবর্ষের মধ্যযুগের এই নব বৈষ্ণব ধর্ম সনাতন হিন্দু ধর্মের একটি নবশাখা মাত্র। তবে এই নবত্বের কারণ মুসলমান ধর্মের প্রভাব। মুসলমান ধর্ম যে প্রধানত ঐকান্তিক ভক্তির ধর্ম, একথা কে না জানে? ভারতবর্ষের মধ্যযুগের বৈষ্ণবধর্ম যে মুসলমান ধর্মের এতটা গা-ঘেঁষা, তার কারণ পাঁচশ বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান ধর্ম পাশাপাশি বাস করে আসছিল’। নববৈষ্ণব ধর্মের মধ্যে যে পৌত্তলিকতা বর্জিত একশ্বরবাদী চিন্তার ধারণা আছে সুফি চিন্তাধারার সঙ্গে তার অনেকটাই মিল। ষোড়শ শতাব্দীতে গিয়ে যখন বাউল সাধকদের উল্লেখ দেখা যায় নদীয়ার আশেপাশে, তাতে স্বভাবতই মনে করা যেতে পারে এই সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈষ্ণব চিন্তা ও সুফি ভাবধারার ছাপ আছে। বাউলতত্ত্বে বারবার বলা হয় নিজেকে জানার কথা, খানিকটা যেন ঊপনিষদের ‘আত্মানং বিদ্ধি’ বা গ্রীক দার্শনিক প্লেটোর চিন্তার প্রতিফলন – ‘know thyself। বৈষ্ণবরা কৃষ-প্রেমের মধ্য দিয়ে যেখানে পৌঁছোতে চায়, সুফিতত্ত্ব যে ‘এক এবং অদ্বিতীয়’-কে জানতে চায়, তত্ত্বজ্ঞ বাউল তার কোন নামকরণ বা চিহ্নিতকরণ করতে পারেন নি। তাই তাকে ‘মনের মানুষ’ বা কখনো শুধু ‘মন’ বা কখনো আবার ‘অচিন পাখি’ ডেকেছেন। এই অধরা অজানাকে জানার রহস্যভেদ করার আকুলতাই বাউল গানের ছত্রে ছত্রে ধ্বনিত হয়।
আলেখ দুনিয়ার বীজে আলেখে সাঁই বিরাজে
আলেখে খবর নিছে, আলেখে কয় কথা।
.......
আলেখ মানুষের রসে সনাতন সদা ভাসে
বাউলে তোর লাগল দিশে যেতে নারবি সেথা’।
এক্ষেত্রে আলেখ সাঁই শব্দটি হয়তো অলক্ষ্য স্বামীর অপভ্রংশ। সুফিসন্তদের মতো বাউলরা সেই অজানাকে জানা ও চেনার দুর্জ্ঞেয় রহস্য ভেদ করতে চান প্রেমের মাধ্যমে যা মনের গভীরে তুষের আগুনের মত সর্বদাই জ্বলছে। এই প্রেমানলে সুফি দরবেশ যেমন পাগল, বাউলও হন বাতুল বা উন্মাদ। বাউলের এই উন্মাদ অবস্থার পরিচয় পাওয়া যায় তার গানে:
‘আসার সাঁই দরদী আর কতদিন রব?
দেশ বিদেশে ঘুরিয়া বেড়াই, আর বা কোথা পাব?
যার জন্যে হয়েছি পাগল, তারে কোথায় পাব?
মনের আগুন দ্বিগুণ জ্বলে তারে কি দিয়ে নিবাব?’
এই প্রেমোন্মাদনার মাধ্যমে বাউল সব সময় সেই অজ্ঞাত রহস্যময়কে জানার চেষ্টা করে চলেন। স্বভাবতই পারেন না। তাই সুফি কিম্বা বেদান্তজ্ঞানীর মত তিনি দৃষ্টি ফেরান নিজের ভেতর। তিনি বলতে পারেন সেই কারণে – ‘যা নেই ভান্ডে, তা নেই ব্রম্মান্ডে’। এখানে ভান্ড অর্থ এই শরীর। এই ভাবনার সঙ্গে সুফি ‘কুরবাত’-এর ধারণা সমাপতিত হয়ে যায়। বাউল ধ্যানধারণার মধ্যে এভাবে একদিকে যেমন প্রচ্ছন্নভাবে বৈষ্ণব প্রেমতত্ত্ব মিশে আছে তেমনি আছে সুফি আত্মোপলদ্ধির ধারণা। বাউল মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন এই অজ্ঞেয়-অধরা আর কোথাও নয়, মন্দিরে নয়, মসজিদে নয়, গীর্জায় নয় আছেন এই শরীরের খোলেই। যদিও তিনি রহস্যময় কিন্তু সঠিক ভাবে ডাকলে তাঁর সাড়া অবশ্যই পাওয়া যায়।
মানুষ হাওয়ায় চলে, হাওয়ায় ফিরে, হাওয়ার সনে রয়।
দেহের মাঝে আছে রে সোনার মানুষ ডাকলে কথা কয়’।
এই রহস্যভেদের জন্য বাউল দ্বারস্থ হন গুরু বা মুর্শিদের কাছে ঠিক যেমন সুফিভক্ত যান পীরের দরজায়। গৎ বাঁধা ধর্মাচরণ বাউলের নয়। তীর্থভ্রমণ, পূজাপাঠ, এবং অনুষ্ঠান-আচার যেমন বাউলের কাছে পরিত্যাজ্য সুফির কাছেও তেমনি।
আমার নাই মন্দির কি মসজিদ
পূজা কি বকরিদ
তিলে তিলে মোর মক্কা কাশী
পলে পলে সুদিক’।
সুফিসাধক এবং হিন্দু তত্ত্বজ্ঞানীর মত বাউলও বিশ্বাস করেন সংসার মায়াময়। এই পার্থিব জীবন মরীচিকা। তাই তো বাউল নিজের চারপাশে গড়ে তোলে পার্থিব জীবন বিমুখ মনোভাব। সুফি অনুগামী বা হিন্দু তাত্ত্বিকের থেকে বাউল এখানে স্বতন্ত্র। সুফি চিন্তার সঙ্গে অনেক সমাপতন সত্বেও বাউলকে দেখা যায় এক নিজস্ব রীতিনিয়ম তৈরী করে নিতে। তিনি কোন জাতপাতের উপর নির্ভরশীল নন। তাঁর নিজস্ব পথ স্বকীয় চিন্তার আলোকে উদ্ভাসিত হয়। তুলনামূলকভাবে সুফিবাদ দৃশ্যতই এবং পরিপূর্ণভাবে ইসলামনির্ভর। সুফি ভাববাদ যেহেতু ‘আল্লা’ নির্ভর, তাই তাঁদের ‘পরম লক্ষ্য’-র ব্যাপারে ধ্যানধারণা অনেক স্বচ্ছ। এ ব্যাপারে বাউলদর্শন অনেকটাই অনিশ্চিয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত। এত সব সমাপতন থেকে, সে কাকতালীয় হোক আর ইচ্ছাকৃত, ধারণা করা যেতে পারে বাউলতত্ব বৈষ্ণববাদী প্রেম ও সুফি একেশ্বরবাদী আত্ম-অনুসন্ধান ও আত্মোপলব্ধির ভিতের উপর গড়া।
বাউল ভাববাদের এই পরিপ্রেক্ষিতটির কথা মাথায় রাখলে বাউল-শ্রেষ্ঠ লালন সাঁইয়ের জীবনাদর্শে আলোকপাত অনেক সহজ হয়ে আসে। অনেকেই জানেন লালনের জন্মবৃত্তান্ত প্রায় সবটাই ধোঁয়াশা। কোথায় তাঁর জন্ম হয়েছিল কেউ জানে না। লালন নিজে এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলেন নি। মলম এবং মতিজান নামক এক কৃষক দম্পতি গুটিবসন্তে আক্রান্ত মূমুর্ষূ এক বালককে উদ্ধার করেছিলেন কালীগঙ্গা নদীর চর থেকে। এই নিঃসন্তান দম্পতিই সন্তান স্নেহে লালনকে মানুষ করেছিলেন। সেসময় লালন এক কিশোর। কিন্তু তাঁর পিতামাতা, গ্রাম-দেশ সম্বন্ধে কাউকে কিছু জানাননি তিনি। সেই বয়স থেকেই প্রথাগত ধর্মসম্প্রদায় এবং জাতপাত ভিত্তিক ধারণার বাইরে বেরিয়ে এক অসাম্প্রদায়িক বিশ্বাসের পথে এগোচ্ছিলেন তিনি। পরবর্তী জীবনে এই মনোভাবই লালনের দর্শন চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নিয়েছিল। তাই তিনি পরিণত বয়সে বলতে পেরেছিলেন :
‘লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে।
কেউ মালা কেউ তসবী গলে তাইতোরে জাত ভিন্ন বলে
যাওয়া কিন্বা আসার বেলায় জাতের চিহ্ন রয় কারে’।
আজকালকার সাম্প্রদায়িক হানাহানি ও বিদ্বেষের মুখে লালনের এই দর্শন যে ভীষণই বৈপ্লবিক ও প্রাসঙ্গিক সে সন্দেহ নেই। কুষ্টিয়ার ছেউরিয়ায় যেখানে লালনের আখড়া, তা একসময় বৃহত্তর নদীয়ার অংশ ছিল। আগেই বলা হয়েছে যে সুপ্রাচীন নদীয়ায় বৈষ্ণব ও সুফিবাদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল যার ছাপ আমরা বাউল সঙ্গীতে লক্ষ্য করি। লালন এই জায়গার লোক হওয়ার সুবাদে তাঁর চিন্তাধারাতেও বৈষ্ণবীয় ভক্তিবাদ এবং সুফিবাদের প্রভাব থেকে থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। সুফিসন্তদের মতো তিনিও ভাবতেন আপনাকে জানার মধ্যেই আছে জগতের রহস্যভেদের চাবিকাঠি। সেই ‘অপার-অজানা’ আছেন আমাদের এই দেহ-দেউলেই। এই শরীরের খোলেই। দেহ এক মাধ্যম ও বাহক - তার বেশী কিছু নয়। দেহ নষ্ট হবে কিন্তু চলতেই থাকবে দেহ থেকে দেহান্তরে ‘অচিন পাখি’র আনাগোনা। লালনের এই ধ্যানধারণা, বিখ্যাত দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ দেকার্তে-র দার্শনিক চিন্তার সমান্তরাল। দেকার্তে বলেছিলেন – ‘cogito ergo sum বা সাদা কথায় ‘I think, therefore I exist। চিন্তা ভাবনার ধারক ও বাহক হিসেবে অস্তিত্ব আছে এই শরীরের। লালনও বললেন -
‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’।
এই খাঁচা (দেহ) যেদিন খসে পড়বে- ‘লালন কয় খাঁচা খুলে সে পাখি কোনখানে পালায়’। মোদ্দা কথা দেহ বিনষ্ট হবে কিন্তু আত্মা ও মন রয়ে যাবে। গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন ‘বাসাংসি জীর্নানি যথা বিহায়’ ইত্যাদি। বাসা জীর্ণ হলে পাখি যেমন বাসা বদল করে, শরীররূপী এই খাঁচা খসে পড়লে পাখি মুক্ত হয়ে বাসা বদল করে। এই আধ্যাত্ম চিন্তা এতটাই শাশ্বত যে ধর্ম ও জাতের জায়গা এখানে কোথায়? সেই কারণেই লালনের চিন্তাভাবনার দর্শনকে কোন প্রথাগত ধর্মের গন্ডিতে বাঁধা মুশকিল।
মন্দির মসজিদে লালনের বড় অনীহা ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচরণের বিরুদ্ধতা বাউলরা সব সময়েই করেছেন একথা আগেই বলেছি। কোন তীর্থস্থানে যেতে হবে না। এই দেহই সব মসজিদের শেষ মসজিদ, সব মন্দিরের শেষ মন্দির। লালন তাই বলেন:
আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে
দেখল নারে মন ভেয়ে
দেশ দেশান্তরে দৌঁড়ে এবার
মরিস কেন হাঁপিয়ে’।
তিনি বলেন:
দশ দুয়ারী মানুষ মক্কা
গুরুপদে ডুবে দেখ গা
ধাক্কা সামলায়ে
ফকির লালন বলে সে যে গুপ্ত মক্কা
আদি ইমাম সেই মিঞে’।
বাউলের কাছে মন্দির এই দেহ, মসজিদ এই দেহ, মক্কা-মদিনা-কাশী-বৃন্দাবন এই দেহ। সুফি দর্শনের সঙ্গে লালন বা বাউল দর্শনের বৈপরিত্য এখানেই। মানব-শরীরের মাধ্যমে সেই ‘মিঞে’–কে ধরার প্রয়াস কেবল বাউলই করেন।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল যে বাউলরা তথাকথিত বিদ্বৎসমাজে ও সমাজের উঁচুস্তরে প্রায় ব্রাত্যই ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এই সম্প্রদায়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ নতুন করে জাগিয়ে তুললেন। রবীন্দ্রনাথ এবং লালন প্রায় একই সময় পৃথিবীতে ছিলেন। তিনি লালনের প্রভাবে এতটাই প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন যে তাঁর কাব্য চিন্তায় বাউ-দর্শন এ বিশেষ জায়গা করে নিয়েছিল। যাই হোক লালনের ভাবনার প্রতিফলন দেখা গেল তাঁর গানে :
আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে/দেখতে আমি পাইনি তোমায় দেখতে আমি পাইনি’। কিম্বা তিনি যখন বলেন ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে তাই হেরি তায় সকলখানে’, তখন লালন-রবীন্দ্রনাথ-দেকার্তে-প্লেটো—সুফি-সন্ত সব একাকার হয়ে যায়। মনুষ্যত্বের আদর্শ ও চিন্তাই এই চিন্তার মূলভিত্তি। নিজেকে জানা ও চেনার মধ্য দিয়েই জানা যাবে ‘তাঁকে’ – আর কোন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মাচরণ ও তদজনিত ভেদবুদ্ধির প্রচার ও বিচারের দরকার নেই। এ কথাই লালন তাঁর সমগ্র জীবন ও চিন্তায় প্রতিফলন করে গেছেন।
লালনের বাউল-ভাবনায় বাংলার মধ্যযুগীয় নববৈষ্ণব চিন্তা ও সুফি ভাববাদের গভীর প্রভাব আছে। সুফি ভাবধারার সঙ্গে অনেক সাদৃশ্য থাকায় লালনকে অনেকে সুফি-সাধকও বলেছেন। সাম্প্রতিক গবেষকরা এ ব্যাপারে নির্দ্বিধায় বলেছেন লালন সুফি ছিলেন না। কেন? সুফি-দর্শন প্রথমত এবং প্রধানত ইসলাম ধর্মের মধ্যেই বেড়ে ওঠা এক অধ্যাত্ম চিন্তা। সুফিরা ‘আল্লা’ ছাড়া আর কারো অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। আল্লার প্রতি অপার ভক্তির মাধ্যমে সুফি সাধক সেই ‘পরম’-কে পেতে চান। এখানেই লালনের চিন্তাধারা বিপরীত মেরুতে অবস্থিত। লালন এবং বাউল-দর্শন মানবদেহের অভ্যন্তরে যে ‘মনপাখি’, মনের মানুষ’ আছে তাঁকে জানার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুতে বিশ্বাস করেন না। সেই চিন্তায় আল্লা নেই, কৃষ্ণ নেই। মানুষ তার কাছে আল্লা। তাই তিনি বলতে পারেন :
আল্লা কে বোঝে তোমার অপার লীলে
তুমি আপনি আল্লা ডাকো আল্লা বলে’।
লালন সেই অর্থে সুফিদের মত ধর্মযাজক ছিলেন না। ফারহাদ মাজহার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন লালনকে সুফি বলে ভুল করা হয় এই কারণে যে তাঁর গানে প্রচুর আরবী শব্দ ও ইসলামিক ভাবনা চিন্তার প্রতিফলন আছে। কিন্তু অত্যন্ত সতর্ক ভাবেই তিনি সুফিদের থেকে নিজেকে সরিয়ে এক স্বতন্ত্র দর্শনের উদ্ভাবন করেছিলেন যা প্রথাগত ইসলাম থেকে অনেক দূরে। আল্লাকে বা ‘অচিন পাখি’-কে দেখো এই মানবদেহেই – অন্য কোথাও নয়, অন্য কোন তীর্থে নয়।
লালনের ভাবনা ও দর্শন সুফি দর্শন এবং বৈষ্ণবীয় ভাব রসের জারণে জারিত এক স্বতন্ত্র চিন্তা যা গ্রাম বাংলার লোকসংস্কৃতির আধারে পরিপুষ্ট হয়েছিল। তিনি বৈষ্ণব নন, সুফি নন, হিন্দু নন, মুসলিম নন। জাতের ফাৎনা তিনি ডুবিয়েছেন সাধ-বাজারে। তিনি ব্যাকুল স্বরে বলতে পারেন:
বিবিদের নাই মুসলমানী
পৈতে নেই যার সেও বামনী।
বোঝ রে ভাই দিব্যজ্ঞানী
লালন তেমনি জাত একখানা’।

মোহা ম্মদ রফিক উজ্জামা ন আর ফকির মোহাম্মাদ আলী-র কথায় ...
লালন সাঁই, ফকির লালন জাত-পাতের বহু উর্ধে এক তত্বজ্ঞ দিব্যজ্ঞানী। একজন শাহানশাহ্।
তবে আমি সাঁইজিকে কেন শাহানশাহ্ বলে আখ্যায়িত করেছি, সে সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়োজন আছে। সুফি বা ফকিরি সাধনায় যাঁরা সিদ্ধিলাভের পথে অগ্রসর হন, এক পর্যায়ে এসে তাঁদের নির্দিষ্ট দুটি পথের একটি পথ বেছে নিতে হয়। পথ দু’টি হলো— স্লকুমত ও হিকমত। এখানে ‘স্লকুমত’ শব্দের অর্থ রাজস্ব বা বাদশাহী। ‘হিকমত’ শব্দের অর্থ অলৌকিক ক্ষমতা। জাগতিক ক্ষেত্রে রাজত্ব বা বাদশাহী হচ্ছে শাসন-শোষণ এবং জাগতিক ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা। ফকিরি সাধকের ক্ষেত্রে রাজস্ব বা বাদশাহী হলো সর্বতোভাবে মানুষের কল্যাণ করা। ইসলামের প্রথম চার খলিফা যা দেখিয়ে গেছেন। তাঁরা শাসক হয়েও নিজেকে শাসক না ভেবে, সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে হয়েছিলেন সেবক। মানুষের সেবক। খলিফা হয়েও ছিলেন ফকের। ফকিরি সাধকরাও তেমনি মানুষ সেবা, মানুষ ভজনার কথা বলেছেন। এমনকি স্বপেম্নও তারা মানুষের অকল্যাণের কথা ভাবতে পারতেন না। শত্রুরও নয়। প্রকৃত বাদশাহ্’র রূপ তো এটাই। এই সাধনায় যাঁরা সিদ্ধি লাভ করেন— তাঁরাই হয়ে ওঠেন শাহানশাহ্। সাঁইজি যখন বলেন:
... গঙ্গাজল কূপজল হয়
বিলে বাঁওড় রয়
সাধ্য কি তার গঙ্গাতে যায়
গঙ্গা না এলে পরে...
তখন উপলব্ধি করি, মানুষের মধ্যে স্রষ্টার বসবাসের কথা, জীবাত্মা আর পরমাত্মার সম্পর্কের কথা। গঙ্গা যখন প্লাবিত হয়—তখন গঙ্গার পানি বিল-বাঁওড়ে চলে আসে। প্লাবন শেষে বিল-বাঁওড়ে আবদ্ধ হয়ে যায়। সেই অবস্থাকে সাঁইজি বলেছেন,‘আমায় রাখলেন সাঁই কূপজল করে আধেলা পুকরে (পুকুরে)...’। অর্থাত্ এই দেহ নামক আধেলা পুকরে, গঙ্গাজল’ নামক পরমাত্মার অংশ বদ্ধ হয়ে আছে। তার বাসনা পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হবার। কিন্তু তার সাধ্য কম, তাই তার সাধনার দ্বারা সে অহর্নিশ স্রষ্টাকে আহ্বান জানায়। স্রষ্টা এসে যখন তার সঙ্গে মিলিত হন, তখন সে বিলীন হয়ে যায় স্রষ্টার অস্তিত্বের মধ্যে। স্রষ্টা থেকে এসেছি, আবার স্রষ্টাতে অবলুপ্ত হবো। সাধকের কাছে তাই স্বর্গ-নরকের অস্তিত্ব নেই। ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’-এর ব্যাখ্যা সাধকের কাছে এমনই।
ফকিরি সাধনার মূল কথাই হলো ‘মিলন সাধন’। জগতে সন্তান-সন্ততি রেখে দেহত্যাগে একটা মায়ার পিছুটান থেকে যায়। কোনো পিছুটান নেই যে ফকিরি সাধকের। সে সহজেই মিলিত হতে পারে স্রষ্টার সঙ্গে। একমাত্র ফকির ছাড়া আর সমস্ত জীবাত্মার সাধন হলো সৃজন-সাধন। এও স্রষ্টার এক লীলা। তার সৃষ্টিকে সচল রাখার কৌশল। তবে ফকিরি সাধনা— সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসীর মতো নয়। ফকিরি সাধনায় সাধন-সঙ্গিনী অতি আবশ্যক। সঙ্গিনীর ভূমিকাও প্রায় সমান। কারণ সঙ্গিনী ছাড়া সাধক সম্পূর্ণ নয়। স্রষ্টা ছিলেন আপনাতে আপনি গুপ্ত। নৈরাকারকে আকারে আনতে তিনি আদমকে সৃষ্টি করলেন। কি ছিল সেই আকারবিশিষ্ট আদমের মধ্যে যে, ফেরেশতাকুলকে তিনি নির্দেশ দিলেন আদমকে সেজদা দিতে? সেজদা না দেয়ার অপরাধে আযাযিল ফেরেশতাকে কেন হতে হলো অভিশপ্ত শয়তান ইবলিশ? আল্লাহ ছাড়া যে কাউকে সেজদা দেয়া যায় না— আযাযিল তা জানতেন। তা হলে চিরকালের নিরাকার স্রষ্টা আদমকে সেজদা দিতে বলেছিলেন কেন?— কি রহস্য লুপ্ত ছিল সাকার আদমের ভেতর? কোনো ভেদ বুঝতে না পারায় আযাযিলকে হতে হলো ইবলিশ। স্রষ্টার সেই রহস্য সত্ত্বাই— পূর্ণ মানুষ আদম। নিরাকার স্রষ্টার আকারময় রূপ। তারপর স্রষ্টা আদমকে খণ্ডিত করে হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। তাঁদের আনন্দময় মিলনে একাকার হবার মধ্যেই আবার পূর্ণত্ব লাভ করে মানুষ। একাকার মিলনেই সৃষ্টি হয় সন্তান-সন্ততি। এটাই সৃজন সাধন।
মিলন সাধন শুধু একাকার হওয়াতে পূর্ণ হয় না। দুয়ে মিলে এক নয়, শূন্য হয়ে যেতে হয়। আকার নিয়ে নিরাকারে প্রবেশ করা যায় না। শূন্যের কোনো আকার নেই। তাই শূন্য হয়েই নিরাকারে বিলীন হতে হয়। দুয়ে মিলে প্রথমে এক আকার ধারণ করা, তারপর যে নিরাকার থেকে আকার লাভ, সেই নিরাকারে মিশে সবার জন্য পরমানন্দময় শূন্য হয়ে যাওয়া। স্রষ্টা নিজেই পরমানন্দময়-প্রেমানন্দময়। সাধকের প্রেমানন্দ তাই কামসুখ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। বস্তু পতনে কাম, বস্তুকে চেতনলোকে নিয়ে যাওয়াতেই প্রেম। কামসুখ ক্ষণস্থায়ী। প্রেমানন্দ অক্ষয়।
বাউল মানুষ ভজে, যেখানে সাঁই নিত্য বিরাজে। বাউলের কারবার মানুষ, তার স্রষ্টা এবং তার সৃষ্টির অনুসন্ধান। বাউল সত্যের উপাসক। নিজ পরিমণ্ডলে তার সাধন-ভজন আচার, বিহার। লালন তত্ত্ব হচ্ছে সিনায় সিনায় কারবার। এটা বোঝার বিষয়, বোধের বিষয়, বুঝে নেয়ার বিষয়, বলে কয়ে লালন তত্ত্ব জানা বোঝা মুশকিল। লালন ধারায় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে গুরুকে। গুরুর তত্ত্ব শিষ্য নেবে সিনা থেকে সিনাতে। তাহলেই তো শিষ্য পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। গুরু বাঁধা পড়বেন শিষ্যের সিনাতে। এভাবেই চলে আসছে এভাবেই চলবে। ওই যে সাঁইজি বলে গেছেন ‘ভক্তের ডোরে বাঁধা আছেন সাঁই।’ ডোর মানে রশিটা তো এখানেই।

কৃতজ্ঞতা:
মোমেন মাঝি
আবু ইসহাক হোসেন
প্রদোষ কান্তি সরকার
সুধীর চক্রবর্তী
শক্তিনাথ ঝা
সুরজিৎ সেন
লিয়াকত আলি

গল্প

অর্ণব সেনগুপ্ত-র গল্প
 
ব্যাক ফায়ার
 

(১)
‘নাম আমার আগুন, রূপে আগুন, ঠাপে আগুন’ – এর পর স্লিম কালারড মোবাইল ফোনটা এত গরম হয়ে উঠেছিল যে তাকে কান আর হাতের স্পর্শে রাখা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছিল। তবু আপ্রাণ চেষ্টায় নিজের অনুভূতি প্রকাশ করার তীব্র চেষ্টা চালাচ্ছিলেন কমরেড কামু ভট্টাচার্য। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের ধান আলু লংকা রসগোল্লা পশু পুলিশ ধর্ষক বোমারু মোটরগাড়ি... বিভাগের মন্ত্রী ও পলিটব্যুরো সদস্য। কিন্তু শেষপর্যন্ত কুটিল সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের শিকার হল তার কাব্যিক কামুক অনুভূতি। একটানা কুকুরবে এনগেইজ টোন ছাড়া আর কিছুই কানে আসছিল না তার। বাধ্যতই গরম মোবাইল সেটটা টেবিলের ওপর রেখে দিলেন, অবলোকন করলেন নিজের হাত – কিঞ্চিত্‍ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। শরীরের অন্য অংশের দিকে চোখ ঘোরাতে গিয়ে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন তিনি। আর একটু হলে চেয়ার থেকে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু গেলেন না প্রায়-বিলুপ্ত ইতিহাস মনে পড়ে যাওয়ায়। অবাক হয়ে দেখলেন তার নিজের বাড়া লম্বা হতে হতে তার মাথা স্পর্শ করতে চলেছে। টিপে দেখলেন বেজায় শক্ত। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নরম নিস্তেজ হয়ে লুটিয়ে পড়ার কোনো সিন নেই। ইতিহাসটা কী? মনে পড়ল তার, কৈশোরে কলেজ কেটে জীবনের প্রথম ব্লু-ফিল্ম দ্যাখার সময় ঠিক এ রকমই হয়েছিল তার। এক সপ্তা বাড়িতে ফিরতে পারেননি। ঢপ দিয়েছিলেন বাড়িতে, পার্টির কাজে গ্রামে যেতে হয়েছে বলে। ডাক্তারের ডায়াগনসিসটাও মনে পড়ল তার – বাড়াহিটসহেড ডিজিজ। একুশটা প্রকাণ্ড ইঞ্জেকশন পুশ করার পর নিস্তেজ হয়েছিল ব্যাটা। কিন্তু তারপর বহু রাত, বহু সকাল, বহু দুপুর গড়িয়ে গ্যাছে। এই বাড়া নিয়েই তো বহু ক্রীড়ায় মত্ত হয়েছেন তিনি। তাগড়াই তাগড়াই রাশিয়ান চিনা ভিয়েতনামিজ কিউবান কেরালাইট কমিউনিস্ট নেত্রীদের কাম ক্রীড়ায় কাত করেছেন তিনি। তবে আজ কী হল? সামান্য এক কামোন্মত্ত টেলি যোগাযোগ তাকে চিত্‍ করে দিল। ড্রয়ার থেকে বের করলেন কমরেড লেনিনের লেখা “What is to be done”। সবে সূচিতে চোখ বোলানো শুরু করবেন অমনি নিজের তিনটি মোবাইল ফোন আর দশদিকে রাখা দশটি ল্যান্ড ফোন একসঙ্গে বেজে উঠল। সে রাতে কলকাতার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের টপ বসের ঘরে রাখা একাধিক ফোন এইভাবেই একসঙ্গে বেজে উঠেছিল। সারাদিন কর্মব্যস্ততার পর সন্ধে থেকে রাত নটা সাড়ে নটা অবধি এই সময়টুকুই তাদের নিজস্ব অনুভূতি নিঃসরণের সময় মানে কাব্যিক, কামুক, অ্যালকোহলিক ইত্যাদি আর কী। ফলত বলাই বাহুল্য কামু বাবুর মতো তারাও আর নিজেতে ছিলেন না। এই ধরাধামের বহু গজ ঊর্ধ্বে তখন তাদের বিচরণ। অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিতে। হোয়াইট রামের গেলাস হাতে, কেউবা নরম লাউডগার মতো তন্বী বা বেশ ফুলো ফুলো ডাগর ডোগর নারীর সাথে, চলমান ল্যাপটানো পোজে আর যাদের কিছুই জোটেনি কপালে তারা নিজেদের আখাম্বা হাতে মানে হ্যান্ডেলরত অবস্থায় ছিলেন। কিন্তু বাধ সেধেছিল টেবিলের দশ দিকে রাখা দশটা টেলিফোন আর পার্সোন্যাল মোবাইল ফোন। এক ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখেন কিংবা কোনো মোবাইল সুইচ অফ করেন তো পরমুহূর্তে অন্যটা বেজে ওঠে। অনেকটা রামায়ণের রাম রাবণ-এর যুদ্ধের মতো। রাম একটা মাথা কাটছে তো রাবণের অন্য মাথা তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হচ্ছে। শেষমেশ বাধ্যতই ফোন রিসিভ করতেও হয়েছিল প্রত্যেককে। জরুরি তলব পড়েছিল তাদের। শুধুমাত্র এদের নয়, পার্টির নরকতলা থেকে স্বর্গতলা পর্যন্ত সমস্ত কমরেডকেও হাজিরা দিতে হয়েছিল। সবার গন্তব্য ছিল গলাকাটা গলির পাঁচ নম্বর বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ড ফিফ্‌থ ফ্লোর। কী এমন বাওয়াল ঘটেছিল যে সবাইকে একসাথে কলকাতার বহু স্টেপ ঊর্ধ্বে অবস্থিত ভার্চুয়্যাল কলকাতা-র ক্যাওড়ামো ছেড়ে পাতালপুরীতে প্রবেশ করতে হয়েছিল? বাওয়াল রুখতে কী ব্লু-প্রিন্টই বা তৈরি হচ্ছিল? তা কেউ জানতে পারেনি। প্রেসের প্রশ্নের সামনে সবাই পকেটে রাখা ওয়াকম্যান অন্ করেছিল। আর তা থেকে সুরেলা নারী কণ্ঠ জানিয়েছিল, “ইয়ে অন্দর কী বাত হ্যায়।” সম্ভবত এই কারণেই সে সময়ে কলকাতায় 'ডলার' গেঞ্জি জাঙিয়ার বিক্রি খুব বেড়েছিল।
সেই ফিচেল কলকাতার রাতে সিটি সেন্টারে নাইট শো ছিল হাউসফুল। চলছিল শাহরুখ-এর ওম শান্তি ওম। পাশাপাশি বসে সিনেমা দেখছিল সোনাগাছির টপমোস্ট বেশ্যা শবনম, তরুণ নটদাদা রুদ্রকণ্ঠ মিত্র আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড ম্যাথের প্রফেসর আগুন, দ্য মোস্ট ওয়ান্টেড।  কিন্তু ইন্টারভ্যালের কিছুক্ষণ পরই সমস্ত দর্শক একজোট হয়ে হল থেকে বের করে দিয়েছিল তাদের।  এর পিছনে কারণ অজস্র।  উল্লেখ্য, ছয়: দীপিকা পাড়ুকোন স্টুডিওর ভিতর জ্বলছে। শাহরুখ আপ্রাণ চেষ্টা করছে তাঁকে বাঁচানোর, ঢুকে পড়ছে জ্বলন্ত স্টুডিওর ভিতর। সবাই ভাবছে এইবার, এইবার হয়ত শাহরুখ পারবে মিরাকল ঘটাতে।  হলময় কমপ্লিট সাইলেন্স।  ঠিক সেই সময়ই উত্তেজিত আগুন হাততালি দিয়ে ওঠে।  সেই অকওয়ার্ড হাততালির চোটে এক মিনিট প্রজেকশন বন্ধ হয়ে যায় রিল জড়িয়ে।  আট: বিরতির আগের লাস্ট সিকোয়েন্সে মারা যাচ্ছে শাহরুখ। শেষ নিশ্বাস ফেলার আগের সেকেন্ডে হঠাৎই সুতীব্র গর্জনে পেদে দ্যায় রুদ্রকণ্ঠ মিত্র।  তৎক্ষণাৎ স্পটে গন্ধ আর আওয়াজ মিশ্রিত কারণে অজ্ঞান হন দশ জন দর্শক।  তেরো: ইন্টারভ্যালের পর পরবর্তী জন্মে আবার মিলিত হচ্ছে শাহরুখ, দীপিকা।  এবার গর্জে ওঠে শবনমের নিতম্ব।  আবার বহুলোক অজ্ঞান হন আর বাধ্যতই বাকিরা বেঁচে থাকার তাগিদে একজোট হয়ে বের করে দ্যায় ওদের তিনজনকে।
ওরা তিনজন হল থেকে বেরিয়ে এখন হাঁটছে, হলুদ আলোয় মোড়া রাস্তা দিয়ে হাডকোর দিকে।  ওরা পরস্পর বন্ধু।  এ তথ্য লেখা আছে ওদের ওয়েবসাইটে। www.chudupudu.com।  বন্ধুত্বের কারণ বলে একটা লিংক দেওয়া আছে সাইটে।  যেখানে ক্লিক করলে ভেসে ওঠে “পুরানে বাতে ভুল জানাহি আকল কে বাত হ্যায়” আর “সমঝদারও কে লিয়ে ইশারাহি কাফি হ্যায়”।  ওয়েবসাইটের আর্কাইভ সেকশনে পাওয়া যাবে রুদ্রকণ্ঠ মিত্র-র নাট্যভাবনা, নাট্যতত্ত্ব, নাটকের স্ক্রিপট, অডিও-ভিডিওয় নাটক; আগুন-এর লেখা ম্যাথমেটিক্যাল প্রবন্ধ যেমন – চোদনে ম্যাথ, ক্রিকেটে ম্যাথ, সুইসাইডে ম্যাথ, পেচ্ছাপখানা খোঁজায় ম্যাথ; আর শবনম রচিত কামশাস্ত্র, কামগদ্য, কামকাব্য।  আর তিনজনের যৌথ নির্মাণ চলচ্চিত্র – “চোদার আশায় দিন যায়”।  হাডকো পেরিয়ে বিধাননগর স্টেশন যাওয়ার পথে তিনজন উঠে আসে ফ্লাইওভারের ওপর।  ঠিক মিড পয়েন্টে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে রুদ্রকণ্ঠ মিত্র, হিলহিলে স্বরে আগুন আর শবনম কোরাসে উচ্চারণ করে, “পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরা দোস্ত”।  সেই সুর ছড়িয়ে পড়ে কলকাতার দশ কোণে, এমনকী XXL ভার্চুয়াল কলকাতার আর রিরাইটেইবল পাতার কলকাতায়ও।  ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের কাজ করে উল্টোডাঙ্গার সোনি মিউজিক-এর শোরুমে চালানো গান দিল্ মে মেরে হ্যায় দর্দে ডিস্ক...

কলকাতার ক্রিক রো-এর অ্যালচুদিনো রেস্তোরার ব্যাংকোয়েট হলে চলছে কামিনী ভট্টাচার্য মানে কামু ভট্টাচার্য-র রিয়্যাল লাইফটাইম কমরেড, মানে রেজিস্টার্ড বেড পার্টনার-এর বই প্রকাশ অনুষ্ঠান।  আজকের এই সন্ধেতে শিয়ালদা থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত জোনে মিডিয়ার এনট্রি প্রোহিবিটেড, কিন্তু ইলেকট্রনিক নিউজে উইদাউট ভিস্যুয়াল বাইট খবরটা প্রতি তিরিশ মিনিট অন্তর প্রচার করতে বাধ্য হচ্ছে সব চ্যানেল – আদেশানুসারে।  লাল রিবনের ফাঁস খুলে জংলি প্যাকেট থেকে বইটি বের করেন উদ্বোধক রাকেশ মেহরা।  অন্য পরিচয় কামিনী ভট্টাচার্যর ভার্চুয়াল লাইফ পার্টনার আর XXL কলকাতা নির্মাণকারী সংস্থা লকস্‌মী ইন্টারন্যাশনাল-এর ভোল্টেজ মিটার। 
জংলি প্যাকেট খুলে বই বের করা মাত্র তার ওপর দশ কোণের দশটা পার আলোর দশ হাজার ওয়াট আলো আপতিত হয়।  স্বভাবতই প্রতিফলনের সময় তারা দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে ভুলভাল গলিতে ঢুকে পড়ে।  ফলত উপস্থিত অনেকেরই আন্দারের দেহঢাকা পোশাকের বিশেষ বিশেষ অংশ হাইলাইটেড হয়ে ওঠে।  যাক সে কথা, বইকে তার পরণের জামা খুলিয়ে ন্যাংটো করা মাত্র হাততালি দিয়ে ওঠে সবাই।  সবাই বলতে উপস্থিত হয়েছেন কলকাতার টপ টপ আমলা, মন্ত্রী, স্বর্গতলার পার্টি কমরেড, পশ্চিমবঙ্গ রেনোভেটকারী বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনালের টপ বস, বাংলা ছবির সেক্সি নায়িকা, সিক্সপ্যাক নায়ক, গ্রুপ থিয়েটারের চাপদাড়ি ঢ্যামনা মাগ, পাছামোটা থলথলে চনমনে মাগী।  আর আগুন, শবনম, রুদ্রকণ্ঠ মিত্র।  আদেশানুসারে এদের ক্যামেরা, মোবাইল ফোনও হলের গেটে জমা নেওয়া হয়।  হাততালির সাথে সাথে দশ কোণের উফার থেকে প্রোজেকটেড হয় DHOOM 2-এর গান ক্রেজি কিয়া রে...।  ড্রামসের বিটে নিতম্ব দুলিয়ে রয়্যাল ব্লু কালারের কাঞ্জিভরম, অর্নামেন্টস পরিহিত রয়্যাল ব্লু ঠোঁটের ক্রেজি কামিনী দেবী নিজের বই হাতে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকেন পুং-সমুদ্রে।  তাদের হাতে তুলে দ্যান বই।  বইয়ের নাম – “পশুর আমি পশুর তুমি”।  কামু বাবু এখন অশ্বমেধের ঘোড়া।  ছুটে চলেছেন নারীময় প্রান্তরে।  এক নারী বক্ষ থেকে অন্য নারী বক্ষে।  এক নারী নিতম্ব থেকে অন্য নারী নিতম্বে।  হঠাৎই অশ্বমেধ ঘোড়া বন্দি হয় দুই নারীর বক্ষমধ্যস্থলে।  পায়ের নখ থেকে মাথার চুল অবধি দুজনের দেহে নিজের বিস্ফারিত নেত্র বুলাতে থাকেন কামু বাবু।  এদের একজন শবনম, অন্য জন আগুন।  আগুন পড়ে আছে গোল্ডেন ইয়েলো কালারের সিল্ক।  ঠোঁটময় গোল্ডেন ইয়েলো আভা।  কালো রঙের জামদানিতে শরীর জড়িয়ে রেখেছে শবনম।  ঠোঁটে লাল লিপস্টিক।  দুজনেরই ব্লাউজ স্লিভলেস, লো-কাট, সি-থ্রু; যা জানান দিচ্ছে ভিতরে থাকা 10 mm থিক শুভ্র ব্রেসিয়ার স্ট্র্যাপের হদিশ।  ভদকার গেলাস হাতে থেকে থেকেই খিলখিল করে হাসছে দুজন।  সে-হাসির ভাইব্রেশনে বুক থেকে গড়িয়ে পড়ছে আঁচল।  ভিস্যুয়ালাইজেশনে আনছে স্তন মধ্যবর্তী বিভাজিকাকে।  কখনও বা স্ট্যান্ড ফ্যানের হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে শাড়ির আঁচল দিক বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে।  দৃষ্টিগোচর হচ্ছে সুগভীর নাভিছিদ্র।  এ সবই দেখছেন কামু বাবু।  কপি-পেস্ট করে সেভ করছেন মগজ আর হৃদয়ের মেমরি কার্ডে তৈরি নতুন ফোল্ডারে, যার প্রপার্টি অবশ্যই হিড্ন।  কারণ এ তো ফ্রি অথবা পারচেজেইবল ফোল্ডার নয়।  তাই এত সতর্কতা।  এত কিছুর সঙ্গে আবার দক্ষ সিলি পয়েন্টের ফিল্ডারের মতো ডাইভ মেরে ক্যাচ করছেন আঁচল।  আর তার পর দীর্ঘ সময় নিয়ে তা স্থাপন করছেন যথাস্থানে, যতক্ষণ-না অন্যজনের আঁচল খসে পড়ছে।  যত সময় যাচ্ছে কামু বাবু হয়ে উঠছেন কখনও ক্রেজি, কখনও কুল।  ব্যারিটোন ভয়েসে ফোন নাম্বার চান দুই তরুণীর।  খিলখিল হাসিতে গড়িয়ে পড়ে ওরা দুজন।  ছেনালি দৃষ্টিতে বিদ্ধ হন কামু।  ওরা মিলিয়ে যেতে থাকে ভিড়ে।  অস্ফুট হাস্কি গলায় উচ্চারণ করে “উই উইল কল ইউ ভেরি সুন”, কোরাসে।  হলের বিপরীত কোণে এখন বজ্রকণ্ঠ মিত্রর বজ্রবাহুতে আবদ্ধ কামিনী।  ঠোঁট আর বুক, একে অন্যেরটায় রোল করাচ্ছে ওরা।  হলের মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে কামিনীর রয়্যাল ব্লু কাঞ্জিভরম। 
এখন বাড়ি ফিরছে কামু কামিনী।  রাত দশটায় পার্টি শেষ হয়েছে।  ওদের বুলেটপ্রুফ গাড়ি ছুটে চলেছে নীলচে আলোয় মোড়া বাইপাস দিয়ে সল্টলেকের দিকে।  কিন্তু একটা খটকা থেকেই যাচ্ছে।  যদি সমস্ত মিডিয়া প্রোহিবিটেড হয়েই থাকে, তাহলে এই গল্পের আগের প্যারার ভিস্যুয়াল ফুটেজ সাপ্লাই করছে কে?  কী সেই বাওয়ালি, যা ভেদ করছে “আদেশানুসারে”-র রক্ষাকবচ।  ছুটন্ত অন্ধকার গাড়ির ভিতর মাঝেমাঝে ঝাপটা মারছে বাইপাস-এর নীলচে আলোর স্রোত।  সেই আলোর স্রোতে অস্পষ্ট হলেও বোঝা যাচ্ছে ফেভিকুইক লাগিয়ে কামু কামিনী পরস্পর পরস্পরে ফিক্সট হয়ে আছে।  মাঝে মাঝে সেই ফিক্সট বিভঙ্গই গড়িয়ে যাচ্ছে সিটের এক পাশ থেকে আর এক পাশে।  সফট ভয়েসে বাজছেন বিটোফেন।  হঠাৎই খনা গলায় গাড়ির ডেক থেকে শব্দ নির্গত হয় – “পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরা দোস্ত”।  ফেভিকুইকের মজবুত জোড় ভেঙে কামু কামিনী ছিটকে পড়ে সিটের দু'প্রান্তে। 

পাতালপুরীর গোপন মিটিং সেরে এখন কমরেড কামু ভট্টাচার্য বুলেটপ্রুফ গাড়ি করে ছুটে চলেছেন বাড়ির দিকে।  জরুরি মিটিং বলেই বাড়াহিটসহেড ডিজিজ নিয়েও তাকে আসতে হয়েছে।  অবশ্য কেউ যাতে তার নতুন রূপ দেখতে না পারে, সে জন্য অনেক প্রিকশনও নিতে হয়েছে তাকে।  অসুস্থতার কথা বলে সমস্ত কমরেডদের সঙ্গে এক ঘরে মিটিং-এ বসেননি।  কমরেডরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডের ফিফ্থ ফ্লোরে, আর উনি সিক্সথ ফ্লোরে।  দুটো ফ্লোরকে ক্যামেরা, স্ক্রিন, ল্যাপটপে সংযোগ ঘটিয়ে ডিসকাশন চলেছে।  কমরেডদের ঘরে বড়ো স্ক্রিনে ওনার স্টিল ছবি ফুটেছিল সারাক্ষণ।  আর বক্সে প্রোজেক্ট হচ্ছিল ভয়েস।  আর সেভেন্থ ফ্লোরে ল্যাপটপের মনিটারে কামু বাবু খুঁটিয়ে দেখেছেন কমরেডদের মুখ, হেডফোনে শুনেছেন ওদের আওয়াজ।  বোঝার চেষ্টা করেছেন তাদের আত্মবিশ্বাসে কতটা ভাঁটা পড়েছে।  প্রতি মুহূর্তে বুস্ট-আপ করার চেষ্টা করেছেন কমরেডদের।
গাড়িটা এই মাত্র নন্দন ক্রস করল।  আসন্ন বাওয়ালের চিন্তায় কামু বাবু ঘামছেন।  যথাস্থানে না নামলেও আস্তে আস্তে বাড়াটা অনেকটা নেমে এসেছে।  তবে এখনও উচ্চতা প্রায় বুক সমান।  হাত দিয়ে টেপেন।  আগের থেকে নরম হলেও এখনও এটা বেশ শক্ত।  আগুন-এর কথা মনে পড়ে।  কামিনীর বই প্রকাশ পার্টিতে ফোন নাম্বার চেয়ে আগুন আর শবনম-এর দেওয়া উত্তরও মাথায় ঝিলিক মারে।  মেলানোর চেষ্টা করেন সব কিছুকে।  কামিনীর পার্টি... শবনম... আগুন... এক মাস পর আজ আগুন-এর ফোন... মোবাইলের গরম হাওয়া... শৈশবের রোগের প্রত্যাবর্তন... আর ভয়ংকর থ্রেট।  সমস্ত কিছু গুলিয়ে যায়।  মোবাইল ফোনের কল লিস্ট খুলে ইনকামিং কল মেমরি থেকে ডায়াল করেন আগুনের নাম্বার।  রিপ্লাই আসে সুইচ অফ।  একই উত্তর আসে ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান ড. বোস-কে ফোন করলেও।  কামু বাবু ভাবতে থাকেন তাঁর চল্লিশ বছর পার্টি জীবনে কত চ্যালেঞ্জ তিনি হেলায় গুড়িয়ে দিয়েছেন।  নকশাল, মাওবাদি, সাম্রাজ্যবাদী, আল-কায়দা আরও কত কী।  কিন্তু আজ যে-চ্যালেঞ্জ সন্ধ্যায় মহাকরণে, লালবাজারে, সরাষ্ট্রসচিব, পুলিশ কমিশনার, ডিআইজি, সিআইডি-র ঘরে ইমেল মারফত ল্যান্ড করেছে তা সম্পূর্ণ মিস্টেরিয়াস।  ইমেলে অ্যাটাচ্ট পিডিএফ-এ যা লেখা ছিল:
বন্ধু,
আমরা হাতি।  মানে 'e' ফর এলিফ্যান্ট।  আমরা কোনো রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সংগঠন, বা এনজিও-র মদতপুষ্ট নই।  আমরা হাতিরা, জংলি হাতিরা, পৃথিবীর বৃহৎ বৃহৎ অরণ্যে আমাদের বাস।  আমরা সমস্ত প্রান্তের জংলি হাতিরা জোটবদ্ধ হয়ে কাল দশ দিক থেকে কলকাতার দশটা জায়গা, যথা – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, সোনাগাছি, অ্যাকাডেমি অভ্ ফাইন আর্টস, সিটি সেন্টার, ইডেন, নন্দন, পার্ক স্ট্রিট, শিয়ালদা স্টেশন, গড়িয়াহাট, বেহালা চৌরাস্তা তছনছ করে দেবো। 
বিনীত,
হস্তিমস্তি
সম্পাদক
অল ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড হাতি অ্যাসোসিয়েইশন
ইমেল আইডি:  awwha@hatimeresathi.com
ওয়েবসাইট:  www.hati.com
মনে মনে হেসে ওঠেন কামু।  হতে পারে পুরোটাই জোক, কিন্তু সাবধানের মার নেই।  একঘণ্টার মধ্যে ঢেলে সাজিয়েছেন পুরো শহরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।  রাতটুকু শুধু পঞ্চাশ হাজার পুলিশ পাহারা দেবে।  আর সকাল হলেই এক্সিকিউট হবে বাকি প্ল্যানিং।  এর সঙ্গে গলিতে গলিতে, পাড়ায় পাড়ায়, উথদ্ আর্ম পাহারা দিচ্ছে পার্টির পাঁচ লক্ষ কমরেড।  ইমেলে থ্রেট-করা এরিয়াগুলোতে বাড়তি রাখা হয়েছে জলকামান, আর অত্যাধুনিক বম্।  ক্লান্তিতে কামু বাবু শরীরটা এলিয়ে দ্যান নরম সিটে।  ভাবতে থাকেন আগুনের কামোন্মত্ত সংলাপ – “কাল রাত সাড়ে নটায় আমি আর শবনম অপেক্ষা করব, তোমার জন্য, গড়িয়াহাটের ওয়াইল্ড হোটেলের থার্ড ফ্লোরের একশ দুই নম্বর রুমে”।  প্রথমটায় গলাটা চিনতে না-পেরে উনি বলেছিলেন “কে আপনি?”  চটপট রিপ্লাই আসে, “নাম আমার আগুন, রূপে আগুন, ঠাপে আগুন”।  হঠাৎই কামিনীর কথা মনে পড়ে।  কামিনী এখন জলপাইগুড়িতে আছে।  আজ ওখানে পশু দিবস উদ্‌যাপন করেছে।  কাল করবে কলকাতায়।  কামিনী-কে রিং করেন।
জলপাইগুড়িতে এখন ক্লোজ সিকোয়েন্স চলছে।  রাকেশ মেহরা-র কোলের ওপর কামিনী।  দুজনেই প্রায় উদোম।  প্রায় শব্দটা বসানোর কারণ, রাকেশ এখন খুলতে চলেছে কামিনীর ব্রা।  উন্মুক্ত পিঠের ওপর রাকেশ-এর আঙুল চলাফেরা করতে করতে পৌঁছে যায় ব্রায়ের হুকের উপর।  খোলার মুহূর্তকে থমকে দ্যায় মোবাইলের রিং।  অস্বীকার করতে চায় সে-শব্দকে রাকেশ।  কিন্তু তাকে নিরস্ত্র করে বাহুবন্ধনে থাকা অবস্থাতেই ফোন ধরে প্রায়-উদোম কামিনী।  কামিনী-কে গোটা ইমেল পড়ে শোনায় কামু।  হাসতে থাকে কামিনী।  আর নিজের শরীরকে সাপের মতো রাকেশ-এর শরীরের গলি থেকে গলতায় চালনা করে।  শেষমেশ কামু-কে আস্বস্ত করে কামিনী বলে, “ডোন্ট ওরি, আই উইল বি দেয়ার অল দ্য টাইম বাবা।  ও কে টেল হু অ্যাম আই।  দ্য মাদার অভ্ অল দ্য ওয়াইল্ড অরফ্যান ডিসেব্ল্ড ক্রিয়েচার্স।  দেখো, আমার সামনে সমস্ত হাতি কী-রকম ঠান্ডা হয়ে যাবে, উইদিন আ মিনিট, ও কে, গুড নাইট”।  ফোন রেখে দ্যায় কামিনী, অবশ্য ততক্ষণে খোসা ছাড়িয়ে কামিনীর বুককে নিরাবরণ করে ফেলেছে রাকেশ।  এখন শুধু রাকেশ আর কামিনী।  দাপাদাপি করে চলেছে পরস্পর পরস্পরের ওপর।  কামড়ে দিচ্ছে, আঁচড়ে দিচ্ছে একে অন্যকে।
গাড়িটা এখন লেনিন মূর্তি ক্রস করছে।  গাড়ির কাচ নামিয়ে, স্লো করে দেখতে থাকেন কামু।  একদৃষ্টে দেখতে থাকেন লেনিন-এর দিকে।  কী খুঁজে চলেন মূর্তির গায়ে?  What is to be done?  গাড়িটা আবার স্পিড নিচ্ছে।  ল্যাপটপ খোলেন কামু।  ইমেল এসেছে সিআইডি-র কাছ থেকে – “No trace of email number and website yet found.  One video file just arrived through email from the same ID”।  সঙ্গে একটা অ্যাটাচ্ট ভিডিও।  চালিয়ে তাজ্জব বনে যান কামু।  ভিডিও-র নাম, “কামু কামিনী”।  দশ মিনিটের ভিডিওয় এডিট করে কামিনী-র বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশেষ বিশেষ কয়েকটা মুহূর্ত সাজানো আছে।  শটগুলো কয়েকটা এ রকম:  আগুন আর শবনম-এর আঁচল ধরে কামু – মিড ক্লোজ টপ অ্যাংগেল শট।  ফেইড ইন করছে মিড ক্লোজ লো অ্যাংগেল শট – ধীরে ধীরে আঁচলটাকে রাখছেন স্বস্থানে, যতক্ষণ-না অন্য জনের আঁচল খসে পড়ে।  বিগ ক্লোজ আপ – বজ্রকণ্ঠ মিত্র-র বাহুতে আবদ্ধ কামিনী, কামিনী-র ঠোঁট বুক মিশে যাচ্ছে বজ্র-র ঠোঁটে বুকে।  হয়রান হয়ে যান কামু।  আদেশানুসারের তীব্র আঁটুনি ভেদ করে ক্যামেরা ঢুকল কী করে এই ভেবে।  পরমুহূর্তে সিআইডি-তে গোটা বিষয়টা জানাজানি হওয়ার লজ্জায় কুঁকড়ে ঢুকে যেতে থাকেন গাড়ির সিটের ভিতরে।  নিজেকে সামলে ফোন করতে যান সিআইডি কর্তা-কে, যাতে ভিডিওটার ব্যাপারে অন্য কেউ জানতে না পারে।  ঠিক তখনই ল্যাপটপ স্ক্রিনে ফুটে ওঠে – “পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরা দোস্ত”।

সূর্য ওঠার আগেই কলকাতা দখল নিয়েছে দশ হাজার সিআরপি, পাঁচ হাজার প্যারামিলিটারি, পঞ্চাশ হাজার পুলিশ।  আর পাঁচ লাখ আর্মড ক্যাডার ঘুমের নেশা ঝেড়ে ফেলে আরও সজাগ হয়ে ওঠে।  সারা রাত তন্দ্রার মধ্যে কেটেছে কামুরও।  হাত দিয়ে দ্যাখেন বাড়াটা সম্পূর্ণ নেতিয়ে গ্যাছে।  একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।  ঝালিয়ে নেন শিডিয়্যুল।  সকাল দশটা থেকে বারোটা – মিটিং – সিআইডি চিফ, সরাষ্ট্রসচিব, পুলিশ কমিশনার-এর সঙ্গে।  দুপুর দুটো থেকে পাঁচটা – কামিনী-র পশু দিবস অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি।  সন্ধে ছ'টা তিরিশ – অ্যাকাডেমি অভ্ ফাইন আর্টস-এ রুদ্রকণ্ঠ মিত্র-র নতুন নাটকের প্রদর্শনী ও নাট্য উৎসবে প্রধান অতিথি।  রাত সাড়ে নটা – গড়িয়াহাটের ওয়াইল্ড রেস্তোরাঁয় অ্যাপো উইথ্ শবনম অ্যান্ড আগুন।
দুপুর দুটো অবধি এখনও কোনো হাতি অ্যাটাক হয়নি।  কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন সবাই, বিশেষ করে কামু বাবু।  কিন্তু এখনও তাঁরা প্রত্যেকে প্রতি সেকেন্ডে একই রকম অ্যালার্ট।  গোটা বিষয়টা তাঁরা এখনও মিডিয়া আর পাবলিক-এর থেকে হাইড করে রেখেছে।  ওদিকে দুটোয় শুরুও হয়ে গ্যাছে পশু দিবসের অনুষ্ঠান ময়দানে।  পৌঁছে গ্যাছেন কামু ভট্টাচার্য রাকেশ মেহরা সহ সমস্ত অতিথিই।  হাজির হয়েছে কলকাতার টপ পয়সা খেঁচা ইস্কুলগুলোর বাচ্চারা আর প্রচুর অফিসকাটা কেরানি।  লাইভ টেলিকাস্ট শুরু হয় সমস্ত চ্যানেলে।  বিশাল মঞ্চে সমস্ত অতিথি, তার দু'ধারে অর্ধবৃত্তাকারে খাঁচায় পশুরা নিজেদের জেন্ডার অনুযায়ী কসটিউম পরিহিত।  না ঠিক খাঁচা না, বিভিন্ন পশুর উপযোগী বিভিন্ন কৃত্রিম প্রাকৃতিক পরিবেশ।  আর সামনে খাঁচার শিকের অনুকরণে সারি সারি কৃত্রিম সরু সরু গাছ।  বক্তৃতার পর শুরু হয় পশুদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।  ঘোষণা করতে থাকেন কামিনী।  পশুরা খাঁচা থেকে বেরিয়ে সুশীল মানুষের মতো নাচতে থাকে ট্রেইনারের নির্দেশে – রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে।  এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার মানুষের মতো কথা বলতে পারে।  তারা ইংরেজিতে দর্শকের সঙ্গে কথা বলে, হাত মিলায়।  এতক্ষণ সব ঠিকঠাক সুন্দরই ছিল।  কিন্তু হঠাৎই উত্তেজিত কামিনী মঞ্চ থেকে নেমে আসেন মাঠে, পশুদের মধ্যে।  একটি মেয়ে কুকুর আর একটা ছেলে কুকুরকে নির্বাচন করে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পোজ দিতে থাকেন।  কেলো কাকে বলে!  সুশীল কুকুরদুটো হঠাৎই বাওয়াল হয়ে ওঠে।  দুজনেই কামিনী-র দুহাত কামড়ে ধরে।  তারস্বরে চিৎকার করে কামিনী অজ্ঞান হয়ে যান।  কুকুরদুটো গোটা মাঠময় দৌড়তে শুরু করে।  মাঠময় হুড়োহুড়ি শুরু হয়।  দর্শক, অতিথিরা পালাতে থাকে।  শেষ পর্যন্ত পুলিশ, মিলিটারির যৌথ প্রচেষ্টায় গোটা ঘটনাটা আয়ত্তে আনেন কামু বাবু। 
এখন বিকেল পাঁচটা।  উডল্যান্ডস্ নার্সিংহোমে কামু বাবু।  কামিনী দেবী এখন অনেকটাই সুস্থ।  কিন্তু ডাক্তারের নির্দেশ অনুযায়ী ওনাকে কয়েকদিন অ্যাডমিটেড থাকতে হবে।  কামিনী বাড়ি ফিরতে চাইলেও তাঁকে থাকার জন্য জোর করেন কামু।  অগত্যা থেকেই যেতে হয় কামিনী-কে।  কামু বেরিয়ে আসেন নার্সিংহোম থেকে।  বেশ খুশিই হয়েছেন তিনি, কামিনী-র বাড়ি না ফেরায়।  কারণ, আজ রাত তাহলে নির্বিঘ্নে কাটানো যাবে, শবনম আর আগুন-এর সাথে।  আসন্ন বাওয়ালের থ্রেটও অনেকটা কেটে যাচ্ছে।  এখন অবধি হাতি অ্যাটাক হয়নি।  বিকেল সাড়ে ছ'টায় রুদ্রকণ্ঠ মিত্র-র আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব উদ্বোধন করে নাটক দেখতে বসেন কামু হাউসফুল অ্যাকাডেমিতে।  আজকের এই নাট্য প্রদর্শনী শুধুমাত্র ভিনদেশ থেকে আসা নাট্যদলের সদস্য অভিনেতা নির্দেশকের জন্যই।  নাটক শুরুর আগে রুদ্রকণ্ঠ মিত্র ঘোষণা করেন, “আজ আমাদের রক্তকরবী নাটক এখানে মঞ্চস্থ করার কথা ছিল।  কিন্তু বিশেষ অসুবিধার কারণে আমরা ওই নাটকটার বদলে আমাদের নতুন নাটক যা উৎসবের শেষ দিনে প্রদর্শিত হবে বলে নির্ধারিত ছিল – 'চোদনকীর্তন' – আজ উপস্থাপিত করছি”।  নামটা শুনেই আঁতকে ওঠেন কামু, আর তার পর মঞ্চে ঘটে চলা অশ্লীল কাণ্ড দেখতে না-পেরে তাঁর ডান হাত মুষ্ঠিবদ্ধ হয়ে ওঠে।  কাঁধের ওপর।  কাঁধ আর মাথার সঙ্গে ত্রিভুজাকৃতিতে স্থাপিত হতে চায়।  প্রতিবাদের ভাষা বেরিয়ে আসার আগেই লক্ষ করেন আশেপাশের সবাই ভয়ংকর উপভোগ করছে প্রতিটা দৃশ্য।  তুমুল হাততালিতে গমগম করছে গোটা প্রেক্ষাগৃহ।  ত্রিভুজাকৃতি বিভঙ্গ ব্রেক করে হাত যথাস্থানে নেমে আসতে থাকে।  বুঝতে পারেন, সবাই বিদেশি বলে তাঁকে একা পেয়ে মোক্ষম চাল চেলেছেন রুদ্রকণ্ঠ মিত্র – তাঁর সামনে এ-রাজ্যের সংস্কৃতির পীঠস্থানকে কলুষিত করছেন তাঁকে জোর করে নীরব রেখে।  সিদ্ধান্ত নিয়ে ফ্যালেন, কাল সকালেই মাওবাদি সন্দেহে অ্যারেস্ট করবেন রুদ্র-কে।  কোথায় যেন মনে হয় রুদ্রকণ্ঠ মিত্র আর হাতির থ্রেট পরস্পর ওভারল্যাপ্ট।  হঠাৎই মঞ্চের সব অভিনেতাদের রূপান্তরিত হতে দ্যাখেন হাতিতে।  মঞ্চ জুড়ে এখন শুধু পাল পাল জংলি হাতি।  আবার পরমুহূর্তেই মানুষ।  ভয়ে তাঁর নিজের শরীরটা গুটিয়ে গেলেও অনুভব করেন বাড়াটা আবার লম্বা হচ্ছে।  ঠিক সেই সময়েই আগুন-এর মিস্‌ট কল আসে।  অ্যাকাডেমি থেকে পাগলের মতো ক্ষিপ্রতায় রওনা হন কামু।  নাটকের তখন সবে মাত্র আধ ঘণ্টা হয়েছে।  নাটকটা দু'ঘণ্টার।  বেজায় অশ্লীল খিস্তি, দৃশ্য আর মস্তিতে ভরা।  স্টোরি লাইন – একজন ভিখারির নাট্যসম্রাট হয়ে ওঠা।  নাটক শুরুর আবহ: চুদু চুদ চুদয়ে নমো / চুদু চোদাতে চোদাতে নমো...।  প্রথম দৃশ্যে দ্যাখা যায় এক ভিখিরি রাস্তায় বসে ভিক্ষা করছে গান গাইতে গাইতে – কীসের মাসি, কীসের পিসি, কীসের বৃন্দাবন / এতদিনে জানলাম আমি চোদনে গুপ্তধন।  এই চোদন সংগীতে তাঁর প্রতি একের পর এক মেয়ে আকৃষ্ট হয়।  ভিখিরির অবস্থার উন্নতি হতে থাকে।  তিনি নাট্যসাধনা চালিয়ে যান নিভৃতে।  আস্তে আস্তে হয়ে ওঠেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্য অভিনেতা।  জীবন সায়াহ্নে তিনি তাঁর শেষ অভিনয় করেন পাঞ্জাবি নাটকে।  নাটকটিতে তাঁর অসাধারণ অভিনয় প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে দেশের মধ্যে অন্যতম ধনী এক পাঞ্জাবি তাঁকে এক কোটি টাকা দ্যান।  আর মাইকে ঘোষণা করেন “আপ চোদনগীত মে সর্ব্‌‌‌শ্রেষ্ঠ্ হ্যায়, নাটক মে ভি হ্যায়, হাম সির্ফ সিং হ্যায়, লেকিন আপ নাট্যিয় চোদন সিং হ্যায়”।  এখানেই নাটক শেষ হয়।  শুরুর চুদু আবহ আবারও বাজতে থাকে। 
রাত ন'টা পঁচিশে বুলেটপ্রুফ গাড়িটা পৌঁছায় গড়িয়াহাট ওয়াইল্ড-এ, কামু বাবু পৌঁছে যান একশো দু'নম্বর রুমের সামনে রাত ঠিক সাড়ে ন'টায়।  বাড়াটা টিপে দ্যাখেন সেই এক হাইটে পেট অবধি উঠে দাঁড়িয়ে আছে।  দরজা নক করেন।  মোবাইল ফোনের সেই কণ্ঠ ভিতর থেকে উত্তর দ্যায় “কামিং”।  দরজা খুলে ঢুকে সোফায় বসেন কামু।  ঘরে শবনম বা আগুন-এর কেউ নেই।  ভিতরে যাওয়ার দরজাটাও বন্ধ।  মিনিট দশেক পার হয়ে যায়।  অধৈর্য হয়ে ওঠেন কামু।  আবারও সেই এক কণ্ঠ ভেসে আসে, “ওয়েট বাবা, কামিং”।  আরও মিনিট খানেক পরে দরজা ওপেন হয়।  বেরিয়ে আসছে শবনম আর আগুন, মিহি চিকন শাড়ি পরে, যা স্লিপ করে নেমে যেতে চাইছে শরীর থেকে।  এখন মুখোমুখি কামু আর শবনম।  কামু আর আগুন।  ওরা খিলখিল করে কামোন্মত্ত কণ্ঠে হেসে ওঠে।  আঁচল স্লিপ করে পড়ে যায়।  আর তখনই নিভে যায় ঘরের আলো।  সে-অন্ধকারে কামু অনুভব করেন বাড়াহিটসহেড।  কয়েক মিনিট অন্ধকারে শুধুমাত্র হাসি আর শীৎকারধ্বনি ঘরময় ম-ম করতে থাকে।  নীল আলো ক্রমশ ফেইড-ইন করতে থাকে সারা ঘরে।  আর সেই আলোয় অস্পষ্ট ভাবে কামু দ্যাখেন শবনম আর আগুন-কে।  পরমুহূর্তে শুধু কমরেড লেনিন-কে।  তার পর দুটো জংলি হাতিকে।  এই তিনটে দৃশ্য চক্রাকারে ক্রমাগত দেখতেই থাকেন।  এক সময় স্থির হয়ে যান।  আর কিছুই দেখতে পান না।  কারণ, তাঁর বাড়া ব্যাক ফায়ার করে।  মানে সামনে বাড়তে না-পেরে গুটিয়ে ছোটো হয়ে প্রবেশ করেছে দেহের ভিতর, তার পর বেরিয়ে এসেছে সোজা মুখ দিয়ে।  তাই চোখের সামনে এখন শুধুই বিগ্ বিগ্ ক্লোজ-আপে সেই বাড়াটাই।  সেই সময়েই কলকাতার দশ কোণে শোনা যায় পাল পাল জংলি হাতির গর্জন।  আর কোরাস ফিস্‌‌ফিসানি “পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরা দোস্ত্”।
 

গল্প

পাখি আর মেঘ
ত্রিদিব সেনগুপ্ত

 
এক ছিল পাখি, সে বেজায় উড়ে বেড়াত। পাখিরা তো উড়েই বেড়ায়, কিন্তু এ একদম পাখির পাখি, শুধুই উড়ে বেড়ায়, শুধুই উড়ে বেড়ায়। গুরুজন পাখিরা তাকে দেখে কখনো কখনো চটে যায় – এ কী? উড়ছ তো বুঝলাম, একদিন তো বসবে, থিতু হবে, বাসা বানাবে। এ কেমন ধারা অসংসারী আচরণ। সংসারের তো একটা নিয়ম আছে।
পাখি থতমত খায়, কী বলবে বুঝতে পারে না।
কখনো আবার ওই পাখি নিজেই আর সব পাখিদের বলে, চলো না উড়ে আসি। তুমি তো শুধু এই পাহাড়ের এই বনের এই গাছের পাখি হয়েই রয়ে গেলে, কোনো দেশই দেখলে না। ওই পাহাড়ের ওপারেই আছে থতমত খাওয়া মোহনা, সেখানে জল সব সময় থতমত খেয়ে আছে, উজবুকের মত। ঢেউ বলে ওঠেই না তাতে। এই পাহাড়ে যেমন দেখছ, পাহাড়ি ঝোরা, শুধুই লাফায় আর ছোটে আর চেঁচায় আর ফেনা তৈরি করে তার জল, দেখলেই মনে হয়, এই জলে নামলেই দিল বুঝি চটকে মটকে, কাতুকুতু দিয়ে। ঝোরার সেই জল কি চকচকে‌, যেন পারদ ছিটকে যাচ্ছে। মোহনা মোটেই সেরকম নয়, ভোঁদা মুখ আরো ভোঁতা করে বসে থাকে মোহনার ঘোলাটে জল। কোনো ঢেউ নেই, কোনো রং নেই, কোনো ঝকমক নেই। যেন দিন নেই রাত নেই শুধু ঘুমোচ্ছে। দেখতে দেখতে ঘুমই পেয়ে যায় – সবকিছুই থমথমে।  মোহনার থেকে রংঢং শিখে, সবকিছুই এখানে থমথমে ধূসর, এমনকি দূরের ডাঙাটাও। কচিত কখনো একটু মুখ তোলে শুশুক, বা একটু লাজুক লাফিয়ে নেয় জলের পুঁচকে মাছ। তারা তো আসলে থাকে মোহনার নিচে, তাদের তো আর মোহনা দেখতে হয়না।
আবার, যদি ওই দিকে পাহাড়ের আড়াআড়ি উড়ে যাও, নদী পেরিয়ে, বন পেরিয়ে, দেখবে, গাঁ-এর পর গাঁ। তার পর শহর। আবার, এই দেশ পেরিয়ে আর এক দেশ, সেখানে আছে আরো অনেক অনেক উঁচু এক পাহাড়, সেখানে পাহাড়ের মাথা ঢেকে থাকে বরফ, এই পাহাড়ি ঝোরার পারদ-ঝকঝকে জল জমাট হয়ে আছে, সমস্ত ফেনার সমস্ত সকালের সমস্ত রোদের আলো নিজের গায়ে ভরে নিয়ে।
আর সব পাখিদের কাছে ওই পাখি কত মিনতি করে। চলো না, উড়ে আসি, বন পাহাড় গাঁ শহর দেশ সব দেখে বেরিয়ে, ঘুরে আসি, কত তীর্থও তো দেখা হয়। কোনো পাখিই রাজি হয় না। তারা তো এমন পাগল নয়। তাদের কি যাযাবর হলে চলে? তাদের ঘর আছে, সংসার আছে, বাসা বানানোর দায় আছে। কাঠ কুটো খুঁজে পেতে মুখে করে এনে এনে তাদের বাসা বানানোর কাজ আছে। সেখানে ডিম পাড়া আছে। ডিম ফুটে ছানা বেরোয়। চিঁ চিঁ করে ভারি চেঁচায় সেই ছানারা, চেঁচায় খুব, অথচ বেশ লাগে। মনটা কি আরাম হয়ে যায় মা-বাবা পাখিদের, সেই চিঁ চিঁ শুনে। চিঁ চিঁ করে দিনরাত তাদের শুধু খিদেই পায়, খিদের কোনো লেখাজোখা নেই। শুধুই পোকা চাই, আরো পোকা, আরো বাদাম, আরো আরো ঘাসের বীজ, ছোট ছোট শামুক। খুঁজে খুঁজে এনে দিতে হয় সেসব। সে কি কম কাজ? তাই, সংসারী পাখিদের সময় কই এমনধারা পাগলামোর।
আবার কখনো যে সেসব কেজো পাখিদেরও মন কেমন করে না, দেশ থেকে দেশে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ানোর কথায়, তা নয়। তাদেরও মন উতলা হয় বইকি। তাও, থাকতে হয়, কাজ আছে, ঘর আছে, দায় আছে। নিয়ম ভাঙার সাধ হলেই ভয় পায়, সবাই কী বলবে। একটু সময় মুখ গুঁজে বসে থাকে, দুই ডানার পালকের মধ্যে, তারপরে একসময় ফের ফিরে যায় কাজে, যেতে তো হয়ই, কাজ কি কম।
আর ওই উড়ে বেড়ানো পাগলাটে পাখি দিন দিন খুব একা হয়ে পড়ে। সে শুধু উড়েই বেড়ায়, উড়েই বেড়ায়। কার সাথে সে, সব ওড়ার শেষে, দিনের আলো পেরিয়ে সাঁঝ এলে, দুটো মনের কথা বলবে? কার সাথে দেখা হলেই, ও তুমি, কখন এলে, বলে এক গাল হেসে এক ডালে বসে একটু লেজ দোলাবে, একটু গাছের ছাল খুটখুট করে ঠোঁট মেজে নেবে, যেন গাছের গায়ে ঠোঁট ঠোকা ছাড়া পাখিদের কোনো কাজই হয়না?
একা একলা পাখি এক বন থেকে আর এক বনে, এক দেশ থেকে আর এক দেশে কেবল উড়েই বেড়ায়। মাঝে মাঝে ডানা ধরে আসে, যেন হাওয়ার গায়ে আর নড়ছেই না শরীর, শুধুই থেমে যেতে চাইছে, পিঠের পালকগুলো উপর নিচে নাড়াতেও যেন বেরিয়ে গেল শেষ দমটুকু। তাও, থামে না, থামে না পাখি, ডানা সে নেড়েই চলে, নেড়েই চলে। পাখি জানে, উড়তেই থাকলে, উড়তেই থাকলে, একসময় ডানার টাটিয়ে যাওয়া বেদনা সে আর টের পাবে না, কিছুই আর টের পাবে না সে, শুধু উড়েই চলবে। যেন পাখি মানে শুধু ওড়া, আর কোনো অনুভূতি নেই তার। উড়ে চলতে তাকে হয়ই, নইলে একা একাকী কোনো গাছের ডালে বসা মানেই আরো একবার তার খেয়াল পড়বে, তার কথা শোনার বোঝার জানার কেউ নেই, সে যেন কোনো পাখিই নয়, সে মানে শুধু উড়ে চলা, উড়ে চলা, আর কিছুই নেই তার, শুধু ডানার ঝাপটানি। তাই, সেই ডানার ঝাপটানির ভিতরেই সে রয়ে যেতে চায়, শুধু ওড়া, শুধু ডানার গায়ে হাওয়ার শিরশির, শুধু ওড়া, শুধু ওড়া, তার কোনো শেষ নেই, তাই শুরুও নেই।  
শেষে একদিন সে হঠাত করে খুঁজে পেল তার সাথী। অনেকটা সময় সে একা একা উড়ছিল, এক সময় তার মনে হল, কে একটা তাকে নজর করছে, যেন তার সাথে সাথেই চলেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে, একটু বাদে সে ঠাহর করতে পারল। তারপর তার মনে এল, এ তো হঠাত শুধু আজকের কথা নয়, যেখানেই সে উড়ে যায়, যে আকাশেই, যে বনেই, যে দেশেই, এই এক জন সব সময়েই থাকে তার পাশে পাশে। তার নাম মেঘ। অনেকটা উঁচু দিয়ে উড়ে বেড়ায় তো, তাই আগে তার মনে আসেনি – নইলে, সাথী তো তার আছেই।  
সেদিন থেকেই মেঘের সাথে পাখির ভারি ভাব। এ ওকে না-দেখে তারা একটা দিনও পারে না। সারা দিন কী হল, কী দেখল, দিনের শেষে সব কিছু এর ওকে বলা চাই। সাঁঝ নেমে এলে, পাখি জিরোতে বসল কোনো এক ডালে। মেঘও তখন একটু নিচে নেমে আসে। সাঁঝের আঁধার যেন আরো ঘনিয়ে আসে। কথা বলতে বলতে যেই থামে পাখি, গুম গুম আওয়াজ করে মেঘ তাকে জানান দেয়, তাগাদা দেয়। তার সাথেই বা আর কে কথা বলে। তারও পরে, এক সময় পাখি ঘুমিয়ে পড়ে। আবার নতুন সকাল, নতুন করে ওড়া। মেঘও ওড়ে, আর একটু উপর দিয়ে, যেন পাহারা দেয়। যেই কোনো শিকারী বাজ আসে ছোঁ দিয়ে, মেঘ অমনি আকাশ ঢেকে কালো করে দিল, পাখিও ঝুপ করে পালিয়ে যায় কোনো ফোলাফোলা গাছের পাতার ছায়ায়, বা, পাহাড়ের কোনো পাথরের আড়ালে। বাজ আর তার খোঁজই পায় না।
এমনি করে দিন যায়, দিন থেকে মাস। এক এক করে বেশ কটা মাস গেল। এর মাঝে তারা দুজন, পাখি আর মেঘ, ঘুরে নিল অনেকগুলো দেশ।
ভারি গরমের দেশে গেল তারা দুজন মিলে। মেঘ দেখেই লাফাতে লাগল দেশের ছেলে বুড়োর দল। বনে বনে জানোয়াররা, পারলে গাছগুলোও গান গেয়ে ওঠে। দেশে দেশে কত বর্ষা হল সেই মেঘ থেকে। বর্ষার নতুন জলে বনের গাছে গাছে এল নতুন পাতা ফুল, ফুল থেকে ফল। পাখির উত্সাহ আর ধরে না। ফুলের মধু, গাছের ফল, অঢেল সব কিছু ছড়ানো তার চারদিকে। এমনকি, মরে যাওয়া শুকনো গাছের উঁচু মগডালে বাসা করে থাকা পিঁপড়ের ছানা জীবনে কোনোদিন জল দেখেনি, দেখবে কি, ডিম ফুটে বেরিয়েছে সে এই কদিন হল, আর বর্ষা হয়নি কত মাস, শুকনো মরা গাছের কোটরে জমা বর্ষার জল শুঁড় নেড়ে খেতে খেতে তারও আজ কী ফূর্তি।
দেশ থেকে দেশে মেঘ চলে, তার সাথে সাথে পাখি। সব জায়গায় যে শুধু আমোদ তা নয় একেবারেই। কোনো দেশে মেঘ এত জল ঢালল, ঘর ভেসে গেল কত জনের, কত না-ছাপা হওয়া কবিতা, কত না-ভেবে ওঠা কাহিনী, কত ভালোবাসা ঠিক করে বেড়ে ওঠার আগেই ভেসে গেল জলের তোড়ে। তাদের দেখে খুব খারাপ লাগে পাখির। চোখে জল আসে তার। মেঘ বলে, এরকমই হয়, তার নিজেরই কি কিছু করার আছে নাকি? মেঘ জল বয়ে নিয়ে আসে বটে, সেটুকুই তার কাজ, কোথায় কতটা বর্ষা তা তো সে নিজে ঠিক করে না। তবে কে ঠিক করে? পাখি বুঝতে পারে না। মেঘ বলে, সব কিছুরই একটা নিয়ম আছে, নিয়ম মেনে হয়। নিয়মটা কে করল, কেন করল, তা সে কিছুই জানে না, তবু এটুকু জানে যে, নিয়ম একটা আছে। সকালের রোদ মানে তো শুধু আলো না, ঘুম ভাঙার মজা না, ভোরের বাতাসে শিশিরের চিক লাগানো ঘাসের ডগার দোলা নয়, সেই রোদের তাপই জলকে নিয়ে আসে আকাশে, সেখানে তারা জমে জমে মেঘ হয়। মেঘ বলে, দেশ থেকে কত রকমের হাওয়া আছে, এক এক হাওয়ার এক এক আচরণ, এক এক রকম তাদের তাপ, সেই হাওয়ারা উড়িয়ে নিয়ে চলে মেঘ, দেশ থেকে দেশে। তারাই ঠিক করে দেয়, কোথায় কতটা বর্ষা হবে, কার ঘরে হবে উত্সব, কার জল বয়ে যাওয়া বিজন ঘরের হিম রাতে, চাঁদনি রাতে মেঝের কাদায় উবুড় হয়ে থাকা মরে কঠিন শবের উপরে এসে শিস দেবে সাপ, আর তাকে শিকার করতে জানলার শিকে এসে বসবে পেঁচা, তার রাতদেখা চোখে খুঁজে বেড়াবে শুধু সাপ না, মরে যাওয়া আর পালাতে থাকা মানুষ আর জানোয়ারের শরীর।
কত দেখে, জানে, কিছু শেখে, কিছু ভুলে যায় পাখি। দিন যায়, মাস। খেয়াল করেনি, কবে থেকে যেন চিকণ হতে শুরু করেছে মেঘ, পাতলা হালকা, দিনে দিনে। চোখ কুঁচকে তাকে ঠাহর করতে হয়, খুব জোর রোদে তাকে আর দেখাই যায় না মোটে। যেদিন পাখি খেয়াল করল, অবাক তার গলায় দম যেন আটকে এল, বুকের ধুকধুক গেল বেড়ে। কেন, মেঘ কেন? পাখি ভালো করে কথা বলে উঠতে পারল না। মেঘ বলল, এটাই নিয়ম। আকাশে মেঘ থাকার মাসগুলো শেষ হয়ে এল। পাখি বলে, যাঃ, তবু মেঘের কথাগুলো না-শুনেও পারে না। আবার সেই কথা তার মাথাতেই ঢোকে না। শুনেই উঠতে পারে না পাখি। এতদিন সে একা ছিল, একা থাকাটা সব সময়ে সে জানতেও পারেনি, সে যে একা আছে এটা না-বুঝেই সে একা থাকত। আজ তার খুব ভয় এল। চোখের সামনে বর্ষাশেষের ঝকঝকে আশমানি নীল আকাশটাও দেখতে পায় না যেন। বাতাসে পাকসাঁট খেল পাখি, নিচে আরো নিচে, শুশুকের আর ঝিমোতে থাকা কুমীরের মোহনার দিকে ঝুপ করে পড়ে যেতে থাকে পাখি। পড়ে যেতে থাকে, পড়ে যেতে থাকে। সে কিছু শোনে না, দেখে না, ভাবে না। এই না-ভাবাটুকুও সে টের পায়না। পড়ে যেতে থাকে।
মাছের আঁশের মত চারকোনা বরফির মত ছোট ছোট ঢেউয়ে সাজানো, যেন মরে যাওয়া ছবি, মোহনার আযোজন জলে পড়ে যেতে থাকা পড়ে যেতে থাকা পাখির শরীরে একসময় তার শরীর ফেরত আসে। আবার ডানা নড়ে, যেমন সব কিছুই নড়ে, এক সময় না এক সময়।
পাখি আবার একা। একা সকাল, একা রাত, একা গাছের ডালের গায়ে ভাঙা ডালের গড়িয়ে পড়া কষের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শুনে চলা, হাওয়া বয়, পাতায় পাতায় আওয়াজ হয়, ঝিরঝির ঝিরঝির ঝিরঝির। পাখি ঘাড় তোলে, আকাশের দিকে তাকায়, ধূসর ডাঙার দিকে, তাকিয়ে থাকে। কখন চোখ নামিয়ে নিয়েছিল জানেনা। আবার চটকা ভাঙে, আবার আকাশের দিকে তাকায়। গাছের এই উঁচু ডাল থেকে গোটা চারপাশটা গোল হয়ে বেঁকে দূরে চলে গেছে তার থেকে, পাখির কানে আওয়াজ আসে, পাখি শোনেনি, ঝিরঝির ঝিরঝির ঝিরঝির। এইভাবে রাত নেমেছিল, দূর আরো দূর হয়ে যাওয়া ধূসর জল আর আকাশ আর ডাঙা একসময় কালো হয়ে গেছিল। ঝিরঝির করে রাত নেমেছিল। ধূসর কালো থেকে আবার ধূসর, আবার কালো, দিন রাত দিন রাত দিন রাত।
আরো একটা রাতের পর আরো একটা সকাল এসেছিল। ঝিরঝির আওয়াজ পেরিয়ে পাখির কানে এল, এল কি আদৌ, নাকি সে ভেবে নিয়েছিল, পাখি ও পাখি, পাখি, একটা ডাক। আওয়াজটাও কি চেনা তার? তারপর, অনেক পর, কত যুগের হিম পেরিয়ে, আকাশের দিকে তাকিয়েছিল পাখি। পালকের মত এক আঁশলা মেঘ। ওই কি ডাকছে তাকে?
মেঘ পাখিকে অনেক কিছু বলত। অনেক না হলেও, কিছুটা তার শিখেছিল পাখি। সে বুঝতে পারল, মেঘ এসেছে, আবার নতুন বছরের মেঘ।
অনেকটা সময় অনড় চুপচাপ বসে রইল পাখি। কত যুগ কেটে গেল বসে থাকতে থাকতে থাকতে। তারপর, এখন সে কত ভাবতে পারে, ভেবে নিল, হোক না নতুন বছরের নতুন মেঘ, এই তো মেঘ। আবার সে একা নয়, আবার কয়েকটা মাস, সে আর মেঘ, মেঘ আর সে। তারপর? তারপর আবার সেই একই। আবার নতুন ঋতুর নতুন মেঘ। মেঘ আর পাখি।

গল্প

একটি ছেলের পাঁচটি গল্প
দিবাকর সরকার

 
গল্প এক – ঘুম ও ঘোড়া
 
টগবগ করে ছুটে চলেছে ঘোড়া। ঘোড়ার ওপর জলসাঘরের রাজা। ঘোড়সওয়ার হিসেবে রতুর বেশ নামডাক। কত বার কত ভিন্ন জাতের ঘোড়াকে বাগে এনে, আদর করে, বশ করে চেপে বসেছে তার পিঠে। ছুটে এসেছে মাইল খানেক। সকাল হলে অবশ্য জলসাঘরের ঝাড়বাতি নিভিয়ে দেন মা। চিৎকার চেঁচামেচি করে বের করে আনেন।
 
 
কিন্তু আজ পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। আজ রাতে তার জলসাঘরে প্রবেশ করা হয়নি। সুঠাম ঘোড়ায় চড়ার ইচ্ছেটুকু কেড়ে নিয়েছে একটা সংবাদ। আর সংবাদের কেন্দ্রে থাকা মানুষটিকে দেখতে সে এখন বাস্তুহারা হয়ে অনেক দূরে। একটি সরকারি আরোগ্য নিকেতনে।
 
স্ট্রেচার গাড়ির ওপর যে লোকটাকে নিয়ে যাওয়া হল, তার ডান পা অতিমাত্রায় ফুলে গেছে। হাঁটুর নিচে গোড়ালি অবধি শরীর জোগান দিয়েছে অপরিমেয় রক্ত। মনে হচ্ছে প্লাস্টিকের ব্যাগে মুরগির মাংস রাখা। ছুটে চলেছেন তাঁর স্ত্রী। স্ট্রেচার গাড়ির সমগতিতে। সে উন্মাদিনীর চোখের সামনে গাড়ি চলে গেছে ওই গোড়ালির ওপর। কে আর ধরবে সেই গাড়িটিকে। ঝাঁ চকচকে রাস্তার ওপর চাপা দেওয়ার উৎসাহে চতুর্গুণ গতি ধারণ করে ওই কালো টায়ার এই মুহূর্তে কলকাতার কোন্ রাস্তায় তা অনুমান করতে জনতার ভিড় আরও বেড়ে গেল।
 
পুলিশ! রাতে এসব প্রায়ই হয়! আত্মহত্যা করেছে এক যুবতী। কারণ অনুসন্ধানে পুলিশ তাকে নিয়ে এসেছে এখানে। যখন আনা হয় পুলিশের চ্যাংদোলায়, মুখখানা ছিল ঢাকা। কিন্তু এমার্জেন্সির একটু ভিতরেই দেয়ালের পাশে ডাক্তারের সামনে তার মুখাবরণ খুলে দেয় পুলিশ। তখনই রতুর চোখে উঁকি দেয় অবর্ণনীয় একটি মুখ। আত্মহত্যার শেষেও আত্মবিষণ্ণতা কাটেনি তার। যন্ত্রণার উপশম হবে ভেবেছিল যে দড়িটায়, সে দড়ি তাকে এতটা যন্ত্রণা দিয়েছে যে সে এখন টেরই পাচ্ছে না মূল যন্ত্রণা তার দূর হয়েছে কী না।
 
আরে! এ ছেলেটা তো আমাদের পাড়ারই। কাকুর রুদ্ধশ্বাস কথায় সম্বিৎ ফেরে রতুর। কে, কোন্ ছেলে? সে দেখতে পায় এক তার সমবয়সি যুবক, অন্যের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় ঢুকছে এমার্জেন্সির গহ্বরে। বুক ভেসে গেছে রক্তে। পাড়ায় দল-বিদল সংঘর্ষে তার বাঁ চোখে ক্ষুর চালিয়ে দিয়েছে কেউ। পাশে শুয়ে ছিলেন এক ভদ্রলোক। অনুত্তেজিত। দুই মাসের ওপর যাঁর স্ত্রী আর মেয়ে হাসপাতালে, তার উত্তেজনা প্রশমন হবে বইকী। আর জি কর তার বর্তমান বাসস্থান। দিনে অফিস, দুপুরে হোটেল আর রাতে আর জি কর। এসব ঘটনা তার চোখসওয়া। তবু চিৎকার শুনে চোখ চেপে ঘুরে বললেন, দু-মাসের মধ্যে বার চারেক দেখলাম হারামজাদাকে, যানোয়ার কোথাকার, কী করে কে জানে!
 
কাকু কাকিমার অবস্থা নিয়ে বিচলিত ছিলেন। স্বাভাবিক কারণে খানিকটা অপ্রকৃতস্থ। এখন যেন তার ওপর যেন আরও একটা অস্বস্তির বোঝা চেপে বসল। এক পাড়ায় থাকে। বাজারে দেখাও হয়। তাই বলে অ্যানটিসৌশ্যাল বুঝতে পারেননি।
 
কাকুকে ডাইভার্ট করার জন্য রতুর দাদা পেনশন অ্যাকাউন্টের ব্যাপারে খোঁজখবর নিল, ফ্ল্যাট কদ্দূর জানতে চাইল।
 
এ এক অদ্ভুত দৃশ্য।
 
পাশে এক মুসলিম ভদ্রলোক। উৎসাহী জনতার ধারাভাষ্য অনুযায়ী সে বহুক্ষণ মৃত। সহমর্মীরা নিয়ে গেল তাকে। তার পাশেই এক হিন্দু। শুয়ে আছেন বলে তাকেও বলা হচ্ছে মৃত। অন্তত রতুর দিক থেকে সে খানিকটা মৃত। ছোটো সিংগল বেডখানা রজনিগন্ধার ফ্যাবিউলাস কিছু স্টিক দিয়ে সজ্জিত। স্টিকগুলো যেন গুলির ছররা। চারটি কোণায় অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে এল তার পরিচিত কেউ। একটি বৃত্ত নির্মাণ করে মৃত লোকটিকে কী যেন বলল ওরা। যাক, কী বলল না বলল, তা জানার চন্দ্রবিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই রতুর।
 
সে সরে যেতেই তড়িৎগতিতে সেই জায়গাটা দখল করল রতু। জমির হাহাকার চারিদিকে। দাঁড়ানোর জন্যও আজকাল জমি দখল করতে হয়।
 
রাত দুটো তিন। যদিও তার মোবাইল ঘড়ি মিনিট পাঁচেক এগিয়ে সেট করা। সেই কখন এসেছে। দুরপাল্লার অশ্বের মতো দাদার কালো চকচকে অ্যাকটিভার পিছনে চেপে। তার না আছে ড্রাইভিং সিটে বসার অভ্যাস, না আছে পিছনে বসে সহযাত্রীর চরিত্রে দুরন্ত অভিনয় করার ক্ষমতা। কাজেই ভয় লাগে বইকী। নিশুতি রাতে সমস্ত তন্দ্রা চূর্ণ করে, সমস্ত সন্দিগ্ধ কুকুরকে বাকরুদ্ধ করে দিয়ে নধরকান্তি দুটো টায়ার পিচের সঙ্গে সংঘর্ষের বিপ্লব বজায় রেখে তাদের পৌঁছে দিয়েছিল আর জি কর-এ। পথে উড়ে যাওয়ার সময় স্ট্রিট লাইটের অলস আলো যেন অপারেশন থিয়েটারের আলো। সেই রাস্তায় এখনও কত কাজ হবে, কত অপারেশন, কত লেনদেন। কত কালো টায়ার বৃদ্ধের পা-কে মাংসের দলায় পরিণত করবে, কত ক্ষুর চোখে ধার পরখ করবে, কত যুবতী আত্মহত্যার জন্য প্রস্তুত হবে, তার সংখ্যা বিচার্য না। পিছনের সিটে সতর্ক গ্রিপ, হেলমেটের নিচে চশমার চঞ্চলতা সামলে এগিয়ে যাওয়ার সময় তার মনে হয়েছিল, সত্যিই তো, যদি এই যন্ত্রশকটটা না থাকত, কে নিয়ে যেত এই রাতে! রতুর মনে পড়েছিল, সিঙ্গুরে টাটার জমিদখল, গাড়ি তৈরির ব্যবস্থাপনাকে নস্যাৎ করে দিতে সে পথে নেমেছিল। সে বন্ধুমহলে কলকাতার প্রচুর গাড়ি তুলে দেওয়ার পক্ষে কথা বলেছিল। ভাগ্যিস এই বালখিল্য প্রতিরোধে কান দেয়নি সরকার। যদি এই যন্ত্রশকটটা না থাকত, কে পৌঁছে দিত এই রাতে! বিপ্লব তো মূর্খামি!
 
রমলা কাকিমাও আউট অভ ডেইনজার।
 
আর জি কর হাসপাতাল-এর এমার্জেন্সি। ঢোকার মুখে দালাল চক্রের ইতিউতি চাহনি। এখানে ওখানে নোংরা ও পানের পিকদগ্ধ দেয়াল। বৃষ্টি আসলে নোংরারা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সাবলীল ভঙ্গিমায় ছুটে যায় রুগ্‌ণ জরাক্রান্ত বৃদ্ধের পিঠের নিচে, নির্লজ্জের মতো ভিজিয়ে দেয় জালিজালি হয়ে যাওয়া কাপড়খানা। ভেজা শরীর শারীরিক ভগ্নতা দেখানোর ক্যানভাস হয়ে ওঠে। ভোকাল কর্ড ফুলে ওঠে, কিন্তু আওয়াজ বেরোয় না। সেই প্রতিরোধহীন দেহকে জড়িয়ে ধরে তরলমতি জল উপদ্বীপ সৃষ্টি করার খেলায় মেতে ওঠে।
 
সে এক লাফে সরে যায়। বুঝতে অসুবিধা হয় না তার, মৃতদেহগুলিকে সরিয়ে নিয়ে গেলেও পূর্ণমাত্রায় সরাতে পারেনি। না হলে জায়গাগুলি ফাঁকা থাকত না। তবে এমার্জেন্সির ভিতরেও নয়, ঠিক বাইরেও নয়। দেহদুটি চলে গেলেও যতটা অস্তিত্ব এখনও পড়ে আছে, তাকে ঠেলা মেরে সরিয়ে দিয়ে সে দখল করল একটা সিংগল বেড সমান জমির ফালি। যে অঞ্চল সে অধিকার করল, লুণ্ঠন করল সেখানকার শান্তি। তার অবয়ব ঢেলে দিয়ে জমির শ্বাসরোধ করে সে বসে পড়ল। জমি দখলের মজাটা তাহলে এখানেই! বেঁচে থাকার মজাটা আসলে অন্যের বেঁচে থাকাকে চুরমার করে দিয়েই।
 
দুই হাঁটুর ওপর মুখের বাঁ গাল স্থাপন করল। রমলা কাকিমা, কাকু ও তার পাড়ার বন্ধু, অক্সিজেন সিলিন্ডার, স্যালাইনের কর্ড, শ্যুগার মাপার যন্ত্র, লম্বা গোলাকার হলুদ লাল ট্যাবলেট চোখের নিমেষে মিলিয়ে গেল। কাকিমা ঘুমালো কি-না জানার শক্তিটুকু নিঃশেষিত হলে সে পূর্ণ মাত্রায় অক্সিজেন টানতে লাগল।
 
সে এখন জলসাঘরের অযুত যোজন দূরে এক রহস্যময় উপদ্বীপে। চরম উত্তেজনায় বাকি রাতটুকু কাটানোর জন্য কালো কুচকুচে অ্যাকটিভাটাকে খুঁজতে লাগল।
 
 
 
 
 
 
 
গল্প দুই – স্কুলছুট
 
যখন স্কুলে, ব্যাকরণে ঘোষধ্বনি বুঝতে পারতো না সে। অংক সূত্রানুযায়ী নামবে না তো প্রদোষবাবুর বকুনি। এদিকে জীবনবিজ্ঞানের হঠকারিতা। ওদিকে ইতিহাসে গুহামানবের অস্ত্র গড়ার কারনামা। কেন পড়তে হয় এসব, পড়ে হবেই বা কী, তার অর্থ তার কাছে স্পষ্ট নয়। পেন পেনসিল রবার বই ব্যাগ এসব নিয়ে যাওয়াও বেশ ঝকমারি। তার ওপর কোনো দিন যদি ব্যাজ পরতে ভুলে যায়, প্রহার অবশ্যম্ভাবী। জোরজার করে স্কুলে পাঠানো হয় বলেই সে আসে। দিন যায়, সংস্কৃতের ধাক্কা আসে। সে ধাক্কা যে-সে ধাক্কা নয়। লতাম লতে লতা মুখস্থ করতে না পারায় ক্লাস এইটেই সে স্কুলছুটের দলে নাম লেখায়। অসহ্য দমবন্ধকর পরিস্থিতির চাপে হাঁপ ধরে যাচ্ছিল তার, আর, না পারতে পারতে এক অজানা ভয়। তাই স্কুলপালানোই তার মুখ্যকর্ম হয়ে দাঁড়ায়।
 
পাঁচিল টপকে পগার পার হওয়াই লক্ষ্য। হয় স্কুলের সামনের পাঁচিল, অথবা ছাদখোলা বাথরুমের দেয়ালকে সে টার্গেট করত। সপ্তাহে দুদিন সে এই ভাবে স্কুল থেকে পালাতো। মনিটরের কাছে খবর পেয়ে প্রধান শিক্ষক তলব করলেন নিতাইকে। চারটে রাসভারি থাপ্পড় তার গালে পিঠে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে উশকোখুশকো চুল নিয়ে সে যখন ক্লাসে এসে বসল, বেশির ভাগ ছেলেই চুপ মেরে গেল।
 
মনিটর সায়ক কিছুটা ভয়ে কিছুটা কষ্টে নিতাই-এর পাশে এসে বসল। বলল, দ্যাখ, আমি তো বাধ্য হই নাম লিখতে। তোর নাম না লিখলে আমি শাস্তি পাবো। তুই আর পালাস না, প্লিজ। হেডু বড্ডো মারে।
 
প্রধান শিক্ষক শ্রেণি শিক্ষককে ডেকে জানিয়ে দিলেন একটু নজরে রাখতে। তবু নিজের দেওয়া কড়া শাস্তির ওপর তাঁর অশেষ আস্থা। ওতেই কাজ হবে বলে হাসির উষ্মা ছড়িয়ে দিলেন ঘরের চতুর্দিক। শ্রেণি শিক্ষকের কপালের ভাঁজ খুলতে না খুলতেই এসে গেল গরমের ছুটি।
 
গরমের ছুটিতে নিতাইকে দ্যাখে কে! নিতাই মানে, আমাদের রতু। ওরই নাম গল্পের স্বাদ বদল হেতু নিতাই হয়ে গেছে। পুকুরে ঝাড়া দুঘণ্টা এলোপাথাড়ি সাঁতার। হাঁটুজল গলাজল এক করে উন্মাদের মতো পুকুরবিহার। বিকালে ফুটবল। ওপাড়ার যদুদের সঙ্গে রোজ ম্যাচ। ফ্লাড লাইট নেই, দর্শক নেই, কমেন্টেটর নেই, নেই স্পনসর – তবু এ যেন বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনাল ম্যাচ। ইস্টবেঙ্গল ভার্সাস ব্রেজিল। ওপাড়ার যদু যদি বাইচুং হয়, এপাড়ার নিতাই রোবিনহো। কিন্তু ক্লাসের ডিফারেন্স! গতবারের আগের বার ৬-০, আর গত বছর ৯-০ ছিল। ভাবলেই যদুর গা জ্বলে যায়, নিতাই হ্যাটট্রিক করেছিল। আর এবার? ব্রেজিল তার বেস্ট টিম নিয়ে হাজির! সবাই আশা করছে এক ডজন গোল আর রোবিনহোর ডাবল হ্যাটট্রিক।
 
পোড়া দুপুরের শেষ বেলায় টানটান উত্তেজনায় খেলা শেষ হল। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ঢঙে যদুরা নিতাইদের হারিয়ে দিল ২-০ গোলে। যদু প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেদ করতে না পারলেও মাঝমাঠ থেকে জিদানের মতো এমন দুটো মোক্ষম পাস বাড়িয়েছিল যে পৃথিবীর সবথেকে খারাপ স্ট্রাইকার ট্যালা-ও জালে বল জড়ালো। অ্যাওয়ে ম্যাচে এইরকম কীর্তি স্থাপন অপ্রত্যাশিত ভেবে যদুর কী কান্না!
 
অন্য দিকের দৃশ্যটি বড়োই বিরল। হোম ম্যাচে পর্যুদস্ত কিশোরের কান্না পুকুরের জলে ধুয়ে যাচ্ছে। সে স্নান করছে কান্না ধুয়ে যাওয়ার জন্য। আর ভাবছে, এ কী হল, আজ কিছুতেই গোলমুখে খেলাটা ঠিকঠাক হচ্ছিল না। নিজেকে তার ট্যালার থেকেও খারাপ খেলোয়াড় বলে মনে হচ্ছিল। মান্তুটাও ফালতু খেলেছে। ৩৬ মিনিটের মাথায় নবুটা রেড কার্ড দেখল। তাহলে কি আজকের দিনটাই ওদের সাথে ছিল না? এ বার থেকে কি তাহলে পরাজয়ও অভ্যেস করতে হবে?
 
চৈত্রের সূর্যে তাদের প্রিয় মাঠের ঘাসও হলুদ বর্ণ ধারণ করল। হারের দগদগে ঘা নিয়ে গরমের ছুটি শেষ হয়ে গেল। বরাবরের মতো নিতাই ভুলে গেল ছুটির কাজের কথা। পুরোদমে ক্লাস শুরু। ঘা শুকাতে না শুকাতে অংক স্যারের হাঁকডাক। গরমের ছুটির কাজ আদায় করছেন তিনি। নিতাই বেঞ্চির তলায় ঢুকে গেল। কিন্তু স্যারের তো ইগলের চোখ। ঠিক ধরে ফেলা আর কাজ না-পাওয়ায় পিটুনি।
 
বৈশাখ মধ্যগগনে। স্কুলের টিফিন পিরিয়োডে নিতাইকে দেখা গেল স্কুল গেটে ঠেস দিয়ে আলুকাবলি খাচ্ছে। কে যেন জামায় দিল টান। মান্তুর চোখে পড়ল, কী একটা গুজুরগুজুর করছে ওরা। যা করে করুক, মান্তু চুটিয়ে খেলার নেশায় বিভোর। টিফিন শেষ হওয়ার ঘণ্টা পড়লে হুড়মুড়িয়ে যে যার ক্লাসে ছুটল। সায়ক খেয়াল করল, নিতাই হাওয়া। এবং খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল, এবারও একই পথ। বাথরুমের দেয়াল টপকে। উঁচু ক্লাসের দাদারা নিজেরা পালাতে না পেরে কোপ সংবরণ করতে না পেরে হেডস্যারকে জানিয়ে দিয়েছে।
 
কিছু ছেলেকে তার খোঁজে পাঠালেন উপপ্রধান শিক্ষক। বেজায় চটেছেন তিনি। দ্রুততার সঙ্গে ষষ্ঠ পিরিয়োডের পর স্কুলের পঠনপাঠন সেদিনের জন্য মুলতুবি ঘোষণা করা হল। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল আর স্টাফ কাউন্সিল-এর জরুরি মিটিং। যা উঠে আসবে সিদ্ধান্ত স্বরূপ, জানানো হবে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিকে।
 
যদিও, স্কুলের বাইরে, অনেক দূরের নেতাজি স্পোর্টিং ক্লাব-এর মাঠে তিরগতিতে রক্ষণভাগ ফালাফালা করে এগিয়ে যাচ্ছে নিতাই। বীরেশপল্লির ছেলেরা যদুকে ভাড়া করে এনেছে এই খবর ছোটু স্পাইয়ের মাধ্যমে কানে আসতেই কালীবাড়ির হয়ে নেমে গেছে। কালীবাড়ির হয়ে জীবনে মাঠে নামার ছেলে সে নয়, কিন্তু যদুকে ভাড়া করে আনা হয়েছে, বীরেশপল্লির পক্ষ থেকে সে অগ্রিম পঞ্চাশ টাকা পেয়েছে শুনে নিতাই হাজির হয়েছে বিদেশির মুখে চুনকালি মাখাতে। বল নিয়ে এগোনোই বলে দিচ্ছে যে সামনের টুর্নামেন্টে বীরেশপল্লি মনের ভুলেও যদু-টদুর নাম নেবে না।
 
উচিত শিক্ষা দিতে বাবা-কে ডেকে প্রধান শিক্ষক তাকে বিদেয় করলেন। মনে মনে আনন্দ ধরে রাখতে পারছে না নিতাই। এ যেন সাক্ষাৎ স্বাধীনতা অর্জন। বাবার টিমটিমে মুদির দোকান। উইলস ফ্লেক আর রাকেশ খৈনি ছাড়া বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না। বাড়িতে পড়ার চল নেই। ভাড়ার আড়াইশো টাকা গুনে দিতে বাবার দম ফেটে যায়। একদিক থেকে বাঁচা গেছে, স্কুলের খরচ আর চালাতে হবে না। এ বার ছেলেটাকে রোজগারে নামিয়ে দিতে পারলে তাঁর মরেও শান্তি। তাই নিতাই-এর কানটা ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলেন স্টেশন পার্শ্বস্থ সাইকেল স্ট্যান্ডের মালিকের নিকট।
 
করজোড়ে দাঁড়িয়ে নিতাই-এর বাপ। নিতাই ভুরু কুঁচকে। পাশেই। একটা শেডের তলায় স্যান্ডো গেঞ্জি পরে অভদ্রের মতো দাঁড়িয়ে সাইকেল স্ট্যান্ডের মালিক। ঘোলাটে চাহনি দিয়ে নিতাইকে জরিপ করছেন তিনি। হাতের হাতপাখাটা অর্ধবৃত্ত এঁকে চলেছে।
~ পারবে তো?
~ হ্যাঁ হ্যাঁ, একটু শিখিয়ে-পড়িয়ে নেবেন। আপনার ছেলের মতো।
~ আরে ছেলেরাই আজকাল পকেট মারে!
 
স্থির হল মাসিক দুশো টাকার বিনিময়ে সে সাইকেলগুলো যত্ন করে সাজিয়ে রাখবে আর প্রয়োজনবোধে হুজুরের ফাইফরমাশ খাটবে। বাড়িতে নিতাই-এর মা বললেন, পারবে তো? ও তো জীবনে কোনো দিন সাইকেলই চালায়নি। বাবা ধমকে দিয়ে বললেন, মাসশেষে দুশো টাকা কি আমার শ্বশুর দেবে? শিখতে হবেই! আর ছেলেকে ঘরে পুতুপুতু করে রাখতে হলে নিজে গতরে খাট্ মাগি!
 
যে ভদ্রলোক আগে আসবেন, তাঁর সাইকেল বাইরের দিকে। যিনি গভীর রাতে, তাঁরটা ওই-ই-ই ভিতরে। প্রতি সাইকেল ছাড়ার সময় দুটাকা নিয়ে কালো ব্যাগে ভরতে হবে। কাজটা মোটেও সহজ নয়। ভুরু কুঁচকে সে বোঝার চেষ্টা করে দ্বিতীয় বারের পরাধীনতায় তার স্বাধীনতা প্রথম বারের থেকে কতটা বেশি বা কম।
 
ভোর ছটায় স্ট্যান্ড খোলে। ধুপ ধরায়। চারধারে গন্ধ ছড়িয়ে এগিয়ে যায় বাঁশে টাঙানো গণেশের দিকে। সম্মুখস্থ তাকে রাখা আলুতে পুঁতে দেয়। হুজুরের একটা কথা মাথায় রাখার চেষ্টা চালায় যে স্ট্যান্ডে সাইকেল-এর সঙ্গে বন্ধুত্ব না করলে সাইকেল বেঁকে বসে। মানে সাইকেলের হ্যান্ডেল বেঁকে যায়। একটা পড়লে বাকিগুলো হুড়মুড়িয়ে পড়ে। বেশ কয়েকদিন তাই হয়েছিল। কেই বা অতক্ষণ লাইন দিয়ে দাঁড়াতে চায়? তাই পড়ে গেছে। একদিন এক ভদ্রলোকের সিটকভারটা হেঁচড়ানোর একটা দাগ পড়ে গেল। মালিকের সঙ্গে বচসার শেষে টাকা না দিয়ে তিনি চলে গেলেন। ব্যবসা লাটে উঠবে দেখে মালিক তো রেগে কাঁই। এক মাস পরে বললেন, আর এক সপ্তাহ দেখবো, যদি এ রকম চলতে থাকে, তাহলে বের করে দেবো।
 
এদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কোর কমিটিতে শোরগোল উঠল। সরকার রীতিমতো উদ্‌‌বেগ প্রকাশ করলেন। স্কুলছুটের মতো জ্বলন্ত সমস্যার নিরসনে এক বিরাট সভার আয়োজন করলেন মিনিস্ট্রি অভ হিউম্যান রিসোর্স ডিভেলপমেন্ট। ডিম্বাকৃতির টেবিলে নীল লেবেল জড়ানো জলের বোতল, একহারা মাইক্রোফোন, প্রচুর কাগজপত্র, প্রেস রিপোর্টার, ফটোগ্রাফার, চোখধাঁধানো ফ্ল্যাশ, আর একগুচ্ছ পণ্ডিতের চাঁদের হাট তথা মগের মুলুক।
 
নিতাই-এর হিশাব মেলে না। কুড়িটা সাইকেলে সাইকেল-পিছু দুটাকার হিশেব করে সে মালিককে কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারছে না খোয়া যাওয়া টাকার হিশাব। একজন দুজন করে কতজন যে কাল দেবো পরশু দেবো বলে কাটিয়েছে, সে ভুলেও গেছে। স্মরণেও আসছে না লোকগুলোর মুখ। দু-একজনকে ধরলেও তারা নিজস্ব স্বভাবগুণে অস্বীকার করেছে।
 
কাজকারবার নেই। পেটে লাথি খেয়ে সে এখন বাড়িওলার ছাদে।
 
শিক্ষক-শিক্ষিকা বাড়ি থেকে বাড়ি সার্ভে করছেন। বাবা-মা'র সঙ্গে কথা বলছেন, বোঝাচ্ছেন, কিছু বাড়িতে সন্তানকে স্কুলে না পাঠানোর পিতামাতাকে রীতিমতো বকাঝকা করছেন। কিন্তু স্কুলমুখী করে তোলার ক্ষেত্রে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারি যৌথ অভিযানে সবাই ভুলে গেলেন নিতাই ওরফে রতুকে ফিরিয়ে আনার কথা। তাকে স্কুলমুখী করে তুলে কিছু হবে না জেনেই হয়ত তার কথা শিক্ষাবাহকরা মাথায় আনেননি।
 
ওদিকে রতুবাবু একটা বিসলেরি-র বোতলের একপাশ অন্যপাশে জলের ভিতর দিয়ে দেখছিল জগতটাকে। গালে এখনও বাবার পাঁচ আঙুলের ছাপ। সে-যন্ত্রণা কমে গেছে। বিসলেরি-র বোতল তাকে শান্ত করে তুলেছে। কে বলেছে জগৎ পুড়ে খাক। বাবার দোকানের গায়ে ঝুলে থাকা নারকেল দড়িটায় আগুন ঘুমচোখে থাকে। সরু লিকলিকে একটা ধোঁয়া বেরোয়। যে-ধোঁয়া কোনো দিনই আকাশ টপকাতে পারে না। কোনো কিছুই টপকে বেশি দূর এগোনো যায় না ভেবে সে আশ্রয় গ্রহণ করে তার বাবার কাছেই। সে কাজ পায়, বাবার দোকানেই। যে-দোকানে বিক্রিবাটা হয় না, সে-দোকান চালাতে তার মতো ওস্তাদ পৃথিবীতে আর কেউ নেই।
 
বকতে বকতে কচি-বুড়ো শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রাণ ওষ্ঠাগত। দাবদাহে অস্থির হয়ে ওঠেন তাঁরা। একেই ভাপসা গরম, তার ওপর মাইলের পর মাইল হাঁটা। এসব অনর্থক কাজের কোনো মানে আছে? পয়সা জুটলে না হয় হোতো। অন ডিউটি পেয়ে রোদে ঘুরে সার্ভে করা, স্কুলছুটদের ধরে আনা, ছিঃ, এগুলো কোনো কাজ? স্কুলে ক্লাসে যেতেই ইচ্ছা করে না এঁদের। শিখিয়ে পড়িয়ে হবেটাই বা কী। বাপ-মার ঠিক নেই এমন ছেলেবিলে নিয়ে স্কুল ফেঁদেছে...
 
পদধ্বনি এবং পদধ্বনির প্রতিধ্বনিতে চাপা পড়ে যাবে এদের গোঙানি। অন্তত এমনই ভেবেছিল হিউম্যান রিসোর্স ডিভেলপমেন্ট। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে, উন্নততর ভারতবর্ষের কথা ভেবে, নতুন আইন-এর মাধ্যমে স্কুলছুটদের ঘর থেকে স্কুলঘরে আনার সুবিশাল কর্মযজ্ঞ আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করে তারা। আর তীব্র গরমে বেকার কিশোর তার গাল আর নাকে দোকানের একটা বিসলেরির বোতল চেপে ধরে। জলের স্বাধীনতা আন্দোলনের থিম সং হয়ে ওঠে, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা কুল কুল...
 
***
সংসারের মজাটা হল বাবা-মাকে ঘিরে। তাঁরা থাকলে শৃঙ্খলের সমস্যা, না থাকলে শৃঙ্খলার সমস্যা।
 
গল্প তিন – রতু ও সুকান্ত
 
রতু আর রতু নেই। রাতের পর রাত কাটিয়ে সে আজ সুকান্ত।
 
গল্প চার – বাহাদুর ও লালগড়
 
রক্তে রাঙা অর্জনগড়। ক্যাপশনেই বাজিমাত। ছোটোবেলায় যারা বাহাদুর পড়েনি, তারা জানে না। ওঃ, বাহাদুর ঘোড়া ছুটিয়ে যাবে। বলিষ্ঠ চেহারা। পরনে হালকা কমলা-হলুদ শর্ট পাঞ্জাবি। জিন্সের প্যান্টের রংওলা প্যান্ট। কে জানে, হয়ত জিন্সের প্যান্টই হবে। একটা বিকট বদমাইশ, যার সামনের দাঁত সোনার, তাকে মেরে ও তার চোরাই কারবার ধ্বংস করে উদ্ধার করবে অর্জনগড়। রক্ত ঝরবে ঠিকই, কিন্তু অপ্রয়োজনে নয়। বাহাদুরের বুদ্ধি ও পেশিশক্তি, ভালো পুলিস ও এনসিসি ক্যাডেটদের কেরামতি, এই সব মিলিয়েই বিজয়গাথা রচিত হবে।
 
মমতার উক্তি, প্রয়োজনে যৌথবাহিনি প্রত্যাহার করতে হবে। (কিন্তু অপ্রয়োজনে নয়।)
 
সে দ্যাখে, এক ক্যাপিটালিস্টের হাত থেকে কোনোক্রমে মুক্তি পেয়ে আরেক ক্যাপিটালিস্টের হাতে ধীরে ধীরে নিজেকে সমর্পণ করতে থাকে নির্বোধ লালগড়... নির্বোধতর সবুজগড় হওয়ার প্রয়াসে।
 
গল্প পাঁচ – রতু ও সুকান্ত
 
পাঠক, আপনি নিশ্চয়ই এতক্ষণ ভাবছেন গল্পের গোরুকে শুধু গাছেই নয়, গাছের মগডাল অবধি চড়ানোর ছ্যাবলামো কোন্ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে তা অক্ষ(র)যাত্রাই দেখাতে পারে। হয়ত এও ভাবছেন, গল্প লিখতে বললেই এ লিখে দেবে। এই সব লেখা আবার ছাপাবেও। আসলে নিজেরা বার করে তো, যা খুশি তাই করে। কেউ কেউ ভাবছেন, চারটি গল্পের মধ্যে সবথেকে দুর্বল কাঠামো বিশিষ্ট গল্প প্রথমটি। আরও একটু এগিয়ে বলি, আরও বহুজনে এই অবধি পড়ে ভীষণ চটে গিয়ে বলছেন – কে বলেছে, তোর/তোমার/আপনার কথা ভাবছি? নিজেকে ইমপর্ট্যান্স দেওয়ার কিছুই তো দেখছি না!
 
আর কিছু বলব না। জানি, এবার হাসছেন। আসলে আমি এইটিই এতক্ষণ ধরে দেখতে চাইছি। কে শেষ পর্যন্ত হাসে। কতক্ষণ বাদে এত যন্ত্রণার গল্পগুলো পড়েও গর্দভের মতো হাসে। হাসে এবং মুচকি হেসে নিজের বোকামোকে ভালোবাসে।
................
 
চিঠি শেষ। পাঠকের বোকামোর প্রতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানিয়ে ঘুমাতে যায় রতু। সে হাসে, নিজের বোকামোর প্রতি মিনিট পাঁচেক খিলখিল ছড়িয়ে দেয়। আসলে সে চাকরি করে কীটদগ্ধ ঘৃণ্য পরিবেশ কলুষিত একটি বিরাট উঁচু বিদ্যালয়ে, যেখান থেকে প্রত্যেকদিনই সে পালিয়ে আসতে চায়, ছাত্র নয়, শিক্ষক হিসেবেই, পাঁচিল টপকে। ভাবনা আর ভাবনার বহিঃপ্রকাশের মধ্যে বিরাট ফারাক। সে মুখে বললেও বাস্তবে কিছুই পারে না। তাই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রকে কেন্দ্রিক করে তোলার জন্য দায়ী যেসব চরিত্র, চকিতে তাদের নাম বদলে ফেলে। ভীষণ বোকা টিচার হলে যা হয়, ভীষণ ভীষণ গাধা টিচার হলে যা হয় – ব্যথা লাগলে কেটে গেলে আয়োডিন খোঁজে, হোমিওপ্যাথির সন্ধান করে, কম্পিউটারে মগ্ন থাকে এবং কদাকার বোকার মতো, অতি অতি গাধার মতো সারাদিন পড়িয়ে চলে...

গদ্য

দৃশ্যজন্ম দৃশ্যমৃত্যু


দিবাকর সরকার



বাড়ির ছাদে একটা ঝাঁ চক্‌‌চকে বিড়ালি কার্নিস ধরে হাঁটার প্রচেষ্টায়, আর একটা তেলমজানো কাক এসে তার লেজে ঠোক্কর দিচ্ছে।


এই দৃশ্যটুকু আমি দেখছিলাম। চুলহীন ছাদের ওপর। চিত হয়ে শুয়ে মাদুরের বিছিয়ে থাকার ওপর। এই দৃশ্যের সমস্তটুকু আমি শুষে নিচ্ছিলাম চাবির রিং-এর বৃত্ত দিয়ে। বাঁ চোখ চেপে, বুজে। ডান চোখ কেরামতি করে, খুলে।


বিড়ালিটা আমাদের বাড়ির নয়। সম্ভবত দত্ত বাড়ির নতুন আমদানিও নয়। বিশ্বাস বাড়ির এই জন্যই নয়, কারণ ওঁদের বিড়ালিটা গত পুজোয় রাস্তায় একটা টু-হুইলারের তলায় চলে গেছিল। চ্যাপ্টাও হয়ে গেছিল।


সেই ভেদির সম্পর্কে না বললেই নয় একটু। মৃত্যুর আগের কদিন ওকে কোলে বসিয়ো শ্রীমদ্‌‌ভগদ্‌‌গীতা পড়ে শোনাতেন কাকিমা। এদিকে আমি 'পর্যন্ত' শব্দে য-ফলা বসাই না বলে বাবার সঙ্গে প্রায়শই ঝামেলা লাগাতেন বাবা। মানে অতুলদা'র বাবা, যিনি আমাকে বাংলা পড়াতেন। আর প্রত্যেক দিন আমার কাছে নতুন করে বাংলা বানান শিখতেন। বাংলার বানান বিভাগটা আমার সিদ্ধহস্ত দেখে বেজায় চটে যেতেন উনি। ফলে পরের সময়টুকু ছিল বাবার সঙ্গে তুলকালাম বাধিয়ে দেওয়ার পর্ব। আর তুলকালাম শেষে রেগেমেগে-একশা বাবা এবং অতুলদা'র পরাজিত বাবা যখন যিনি-যাঁর বাড়ির দিকে পা বাড়াতেন, ভেদিসোনা জানলা দিয়ে সড়াৎ ঢুকে পড়ত আমাদের বিছানায়। বিছানা থেকে সন্তর্পণে রান্নাঘরে রান্নাঘরের বাসনসংকুল পথ অতিক্রম করে মাছ মুখে সোজা ছুট্‌‌ লাগাত নিজের বাড়ি। মানে অতুলদাদের বাড়ি আর এই ভাবে, নিজস্ব গৃহস্থের পরাজয় মুখ বুজে সহ্য করতে না পেরে, সে বেচারি, প্রায় প্রত্যেক দিন একবার-না-একবার আমাদের মৎস্যমুখী পরাজয় ঘটাতই।


সেই ভেদি, টু-হুইলার চলে যাবার পরও যখন রাস্তা ছেড়ে আমাদের বাড়ি আসেনি, গালাগালি বা ঝাঁটা কিচ্ছু খেতে আসেনি, ওর ঠিকরে বেরিয়ে আসা ফিলিপাইন টিউবকে ঘিরে বিচ্ছু ছেলেদের গোল্লা গোল্লা চোখের উৎসাহ যখন চরমে, অতুলদা'র বাবার বাক্‌‌‌রোধ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমার কাছে একছটাক অতুলনীয় ঋত্বিক ঘটক।


এই কাকামি-কে যে অতুলদা'র বাবা নির্বাক খেয়াল করছিলেন, তা সহসা আমার দৃষ্টিবৃত্তে ধরা পড়ল। শীতের উড়ন্ত রোদ মাখতে মাখতে তারের জালির ওপর শুকোতে দেওয়া বিউলি ডালের নরমসরম বড়িগুলো পাহারা দিচ্ছিলেন তিনি।


অতুলদা যে-বার মারা যায়, তখন মাটিতে-মাটিতে, পিচে-পিচে, পশ্চিমবঙ্গ, বর্ষার রচনা লিখছে। ১৯৯৪। সে বার মাধ্যমিকের প্রশ্নও নাকি খুব হার্ড হয়েছিল। ভেদি অবশ্য তখনও ওদের বাড়িতে আসেনি যাই হোক, পরীক্ষা দিয়ে সে-ছেলে আর বাড়িমুখো হয়নি। রাস্তায় গুলি খেয়ে মারা যায়। কে বা কারা মারল, কেন মারল, তার কিনারা করার জন্য অবশ্য তিরিশে আইনের পুলিস এখনও আসে। চায়ের পেয়ালায় তাদের অন্-ডিউটি ঠোঁটের সবল টান আমার কানেও এসেছে বার কয়েক।


আমার মনে হয়, বর্ষাই মেরেছে। পা হড়কিয়ে মেরেছে বুলেটে ফুটো করেছে ওর ঢ্যাঙা দেহের বাঁ দিকটা। ...যখন বগলে ফোঁড়া হয়, বাড়িতে বসে কাব্য জরিপ করি না, অথবা মার্জিন অভ্‌‌ মার্জিন পড়তে পড়তে টাটা টি খেতে ভুলে যাই না, তখন এ-সবই ভাবি।...


তবে চিৎকেলিয়ে রাস্তায় যখন পড়েছিল, ওর রক্ত, রাস্তার শরীরে শরীর মিলিয়ে দেবার আবেশে, চারিদিকে শত শত হাত মেলে দিয়েছিল। ওই লাল, যা অ্যাডোব ফটোশপে এখনও আনতে পারেনি, আমাকে আর তাড়া করে বেড়ায় না। পরবর্তীতে ও রকম লাল, মাটি-রক্তের পুনঃশিলীভবন, আমার পঁচিশ বছরের জীবনে আমি অনেক দেখেছি। প্রথম-প্রথম এগুলো দগ্ধ করত। দ্বিতীয়ে-দ্বিতীয়ে এগুলো বিদগ্ধ করেছে।


অন্তঃসারশূন্য ধাতব লেন্সটা চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিলাম। অতুলকাকুও দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে চলে গেলেন। মাদুরটাকে এগরোলের মতো পাকিয়ে সিঁড়ির দিকে যেতেই পাম্প চালানোর আওয়াজ এলো। আর তৎক্ষণাৎ, বায়স-কোপের হাত থেকে বেঁচে কার্নিস থেকে লাফিয়ে চলে গেল বিড়ালিটা। কাকটাও চলে গেল। কলোনিয়াল হ্যাং-ওভারের ইচ্ছাকৃত ইচ্ছায়।


চোখের রমণ শেষে আমিও ফিরলাম। নিচে নীচে।



.................




বাথরুমই পৃথিবীর একমাত্র স্বাধীন জায়গা ~ একথা অনস্বীকার্য। আচ্ছা, স্বাধীন না-বলে স্বেচ্ছাধীন বলি, তাহলে লোকের গোঁসাও হবে না, আবার মিথ্যেও বলা হবে না। দরজা বন্ধ করে এখানে, এই নিজস্ব জগতে, আমি নিজের সত্তা সম্পর্কে সদাজাগ্রত না হয়েও থাকতে পারি। ঘোরো ফেরো, মস্তি করো, জল ঢালো, সাবান ঘষো। তাও আবার উদোম হয়ে এ রকম একটা বস্তুনিষ্ঠ আয়োজন পৃথিবীবাসীর মাথায় কী করে এলো, তা আমাকে সত্যি সত্যিই ভাবায়।


আমি একান্নবর্তী পরিবারে বিশ্বাসী নই। তবু ভাবি, একটা বউ আর গোটা আটচল্লিশ দস্তুর মতো পেটাই স্বাস্থ্যওলা গেঁড়িগুগলি যদি থাকত, আমি বাথরুমে ঢুকে নিশ্চিন্তে শুনতাম তাদের কলকাকলি, অর্থাৎ ক্যালোরব্যালোর। কিন্তু বছর পঞ্চাশ বাদে পৃথিবীটা শুনছি মারা যাবে তাই বউ-বাচ্চার রিস্‌‌ক্ নেওয়াটা ঠিক হবে না।


যাই হোক, বাথরুমের নৈঃশব্দের নাব্যতা অতুলনীয়। নৈঃশব্দের প্লবতায় আমি ভাসি একটা বড়ো টাবে জল নিয়ে তাতে হালকা করে পাছা চুবিয়ে বসে থাকি গরমে এর থেকে শান্তি আর কিছুতেই নেই। ঘরের টেবিলের ওপরে রাখা টেপ থেকে শ্রীকান্ত ভেসে আসে, "বুঝি এলো, বুঝি এলো, ওরে প্রাণ...।" সে-গানের সে-সুর নগ্নতাকেও অস্বীকার করে। কুলুপআঁটা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে আসে দেশ-কাল-পাত্র'র কোনো বাছবিচার করে না এই রবীন্দ্রনাথ। একচেটিয়া বেওসা, প্রলিফারেইশন কাকে বলে, এই আক্কেলমন্দবুড়োর কাছে শেখা উচিত।




............




অতুলদা'র বাবা মারা গেলেন। কাকুর এই জীবনাবসানে পাড়ার মার্জারকুল তাঁর এস্টেট-এ এসে সমবেদনা জানিয়েছিল। মজন্তলি সরকার অবশ্য স্টেট-এ থেকেও জানায়নি। আমার বানান বিভাগের সূচিভেদ্য স্তর অতিক্রম করে অনুভব করেছি সেই ভাষার নিঃসহায় মাতৃত্ব বিড়ালি ও কাকের মধ্যে কলোনিয়াল বৈরিতার অবসানও দেখেছি।


চাবির রিং-এর বৃত্তের মধ্যে উঁকি মেরেছিলাম ওদের এস্টেট-এর অর্ধবৃত্তাকার উঠোনে। ঝাঁ চক্‌‌চকে ওই বিড়ালিটা ততদিনে রঙচটা, চোখেকালি, শীর্ণকায়।


আমার ভাষার নিঃসহায় মাতৃত্বহীনতার মুহূর্তে আরও দুটি দৃশ্য দেখেছি। দত্ত বাড়ির সব থেকে ছোটো সদস্য মিঠাইকে দেখলাম, ওদের কাজের মাসির আরও বাচ্চা ছেলেটিকে গৃহস্থের এক কোণায় ডেকে সদ্য কেনা ক্যাম্বিস বলটা দ্যাখাচ্ছে। আর এক কোণে, মার্জিন অভ্ মার্জিন-এ, কনকচূড় খই, অগুরু, আর ধূপ ~ ছড়ানো, ছিটানো ও ছড়িয়ে পড়ার আগে, দৃশ্যমৃত্যু ও দৃশ্যজন্মের সমাবর্তন উৎসবে নিছক কলোনিয়াল আড্ডায়...